ঐক্যফ্রন্ট আছে কি নেই উদ্যোক্তারাই জানেন না

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রাজনীতিতে চমক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ বর্তমানে আছে কী নেই— সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলতে পারছেন না খোদ এর উদ্যোক্তারাই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ফ্রন্ট গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা শীর্ষস্থানীয় এক নেতা গতকাল সোমবার ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে সরাসরিই বললেন, ‘কার্যত এই ফ্রন্ট এখন আর নেই, বর্তমানে এটা অকার্যকর’।

এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ফ্রন্টের মূল শরিক বিএনপি মনে করছে ঐক্যফ্রন্ট ছাড়াই তারা এখন রাস্তায় নামতে পারছে, ফ্রন্টের কোনো গুরুত্ব এখন আর তাদের কাছে নেই। যার কারণে সম্প্রতি কয়েকটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের বিষয়েও বিএনপি ফ্রন্টের কারো সঙ্গে আলোচনা করেনি।’

নানা টানাপোড়েনের পর অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেন ড. কামাল হোসেন। নির্বাচনের আগে সরকারের পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দিয়ে সর্বদলীয় গ্রহণযোগ্য সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সব ‘রাজবন্দি’র মুক্তিসহ সাত দফা দাবি ও ১১টি লক্ষ্যে এ ফ্রন্টের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিএনপি ও গণফোরাম ছাড়াও ঐক্যফ্রন্টে শরিক হয় আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও ড. নুরুল আমিন ব্যাপারীর বিকল্পধারার একাংশসহ কয়েকটি দল। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নানা নাটকীয়তা শেষে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলেও ভোটের পর ফ্রন্ট থেকে সরে যায়।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে কাজ করেছেন আমাদের দলের মহাসচিব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর), উনি ফ্রন্টের মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ঐক্যফ্রন্ট এখন আছে কী নেই—সেটি আমি বলতে পারছি না। এব্যাপারে আমাদের দলেরও কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নেই।’

সংসদ নির্বাচনের আগে এই ঐক্যফ্রন্ট গঠনকে একটি ফাঁদ হিসেবে মন্তব্য করেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল শরিক এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। সাম্প্রতিককালে একটি সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছেন, ‘বিএনপিকে ভোটে নিয়ে ক্ষমতার বাইরে রাখতেই ঐক্যফ্রন্ট করা হয়েছিল।’

গেল কোরবানির ঈদের রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসভবনে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে বৈঠকে কামাল হোসেনের সঙ্গে ঐক্য ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে যাওয়া নিয়ে খালেদা জিয়া প্রশ্ন তোলেন বলে খবর প্রকাশ করে একাধিক সংবাদমাধ্যম। এব্যাপারে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘কয়েকটি গণমাধ্যমে সম্পূর্ণ অসত্য, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন সংবাদ প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। জাতীয় ঐক্য নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অবকাশ নেই।’

সর্বশেষ গত ৩০ জুন পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে যৌথ বিবৃতি দেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। এরপর ধর্ষণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা ইস্যু সামনে এলেও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আর কোনো বক্তব্য-বিবৃতি আসেনি। ‘ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক’ হিসেবে ড. কামাল হোসেন আগে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠালেও বর্তমানে তিনি বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন শুধুমাত্র গণফোরামের সভাপতি হিসেবে।

ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমরা সবসময়ই বলেছি বৃহত্তর এই ঐক্য রক্ষা করব। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে আমাদের সেই বক্তব্য এখনো অটুট রয়েছে।’

ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আরেক উদ্যোক্তা এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ইত্তেফাককে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট আছে- এটা বলার মতো অবস্থায় নেই। আবার ঐক্যফ্রন্ট নেই—এটাও বলতে পারছি না। বিএনপি তাদের মতো করে রাজনীতি করছে।’

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে গণভবনে দুই দফায় সংলাপে অংশ নেয় ঐক্যফ্রন্ট। সরকার কোনো দাবি না মানলেও ভোটে অংশ নেয় বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনে বিএনপির পাঁচ জন ও গণফোরামের দুই জন প্রার্থী জয়ী হন। নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিলেও নানা নাটকীয়তা শেষে বিএনপি ও গণফোরামের সব সংসদ সদস্যই শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন।

সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও ঐক্যফ্রন্ট গঠনে যে কজন ভূমিকা রাখেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ঐক্যফ্রন্ট বর্তমানে আছে কি-না, গতকাল তার কাছে সরাসরি এ প্রশ্ন রাখা হলে তিনি বলেন, ‘ফ্রন্টের বর্তমানে কোনো কার্যক্রম নেই’। আর ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর দাবি, ‘ঐক্যফ্রন্ট আছে, থাকবে’।

Sharing is caring!