কাজ ছাড়াই জিকে শামীম পেয়েছেন ১০ কোটি!

কোন কাজ করেননি। কিন্তু ঠিকই এসএম গোলাম কিবরিয়া ওরফে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কাজের অতিরিক্ত সাড়ে ১০ কোটি টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। গত বছর দরপত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে গ্রেফতার হন জি কে শামীম।
গণপূর্তের অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন আগারগাঁও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে এ ঘটনা ঘটেছে। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী, জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা কাজ বাতিল করতে গিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সংস্থাটির প্রকৌশলীদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এ তথ্য। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত গণপূর্তের শেরেবাংলা নগর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী-উন্নয়ন) মো. ফজলুল হকের (মধু) বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানায় কর্তৃপক্ষ।
জানতে চাইলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার গতকাল বলেন, ‘নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পে কাজের অতিরিক্ত বিল দেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সরকারের এ বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়। যে প্রতিষ্ঠানকে বিল দেওয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে। এখন এ টাকা আদায় করাও মুশকিল। এ টাকা কীভাবে দেওয়া হয়েছে, কারা দিয়েছে; সব বিষয় মাথায় রেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাপ্তরিক চিঠি থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কাজ শুরু করে জি কে শামীমের মালিকানাধীন জি কে বিল্ডার্স। দুই বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে ১৬৭ কোটি ৭৩ লাখ ৬৯ হাজার ৬৩৩ টাকা ব্যয়ে ১৫ তলা ভবন নির্মাণের জন্য সময় ছিল দুই বছর। এর মধ্যে কাজ শুরু করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান শোর পাইলিংয়ের কাজ শেষ করে হাসপাতালের মূল ভবনের মাটি কাটার কাজ আংশিক শেষ করেছে। বেজমেন্টের ম্যাটের প্রায় ৩০ ভাগ ঢালাই শেষ করে সেখানে ২ ও ৩ নম্বর বেজমেন্টের ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে। কিন্তু জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। ফলে পিপিআর অনুযায়ী জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা কাজটি বাতিল করে কর্তৃপক্ষ। এরপরই কর্তৃপক্ষের নজরে আসে কাজের অতিরিক্ত ১০ কোটি টাকারও বেশি বিল দেওয়া হয়েছে শামীমকে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, জাতীয় নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল নির্মাণকাজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় গত বছর ১৩ জানুয়ারি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। এরপর বিধিমতে নির্মাণকাজের যৌথ পরিমাপের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুল হোসাইনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই বছরের ২২ মার্চ প্রকল্প পরিচালক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ঠিকাদারের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে কাজের যৌথ পরিমাপ করা হয়। সেই যৌথ পরিমাপে সম্পাদিত কাজের মূল্যমান হয়েছে ১৯ কোটি ৫০ লাখ ৯ হাজার ৯৪৫ টাকা। এর মধ্যে ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে ৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। আবার তিন মাসের মাথায় আরও ৩০ জুন আরও ২০ কোটিসহ মোট ২৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারকে। সেই হিসাবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ১০ কোটি ৪৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেশি নিয়েছে।
এ বিষয়ে চলতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩) মো. রোকনউদ্দিন সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনকে চিঠি দিয়ে বিস্তারিত জানতে চান। সেই সঙ্গে কাজের অতিরিক্ত দেওয়া ১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আদায়ের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাও জানতে চান। কিন্তু এ চিঠির পর গত ২৮ মার্চ নির্বাহী প্রকৌশলী কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে জবাব দেন। ফলে টাকা আদায়ের কোনো দাপ্তরিক অগ্রগতিও দেখা যায়নি।
একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর শেরেবাংলা নগর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ফজলুল হক। সেখানে তিনি ২০১৯ সালের ২৬ আগস্ট পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্ব পালনকালে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ ও পরপর দুটি বিল দেওয়া হয়। এ প্রকৌশলীর হাত ধরে শেরেবাংলা নগর ডিভিশনে জি কে শামীম নিটোর প্রকল্প, নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিতাংশ নির্মাণসহ কয়েকশ কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয় শামীম। যার ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের হাতে এ বিতর্কিত ঠিকাদার গ্রেপ্তার হওয়ার পর বেশ জোরেশোরেই আলোচনায় আসে প্রকৌশলী ফজলুল হক মধুর নাম। জি কে শামীমের সঙ্গে ফেঁসে যান তিনিও। শামীমের সম্পৃক্তরা অভিযোগ এনে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)। কিন্তু জি কে শামীমের বিষয়টি কিছুটা আড়াল হওয়ার পর একধাপে ওপরে অর্থাৎ নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) চেয়ারে বসেন তিনি।
প্রকৌশলীরা আরও বলেন, কাজের অতিরিক্ত যে টাকা দেওয়া হয়েছে তা ফিরিয়ে আনা অনেকটাই অসম্ভব। কারণ পিপিআর অনুযায়ী কাজের প্রতিটি চুক্তি ও দায়বদ্ধতা আলাদা। সেখানে এক প্রকল্পের টাকা অন্য প্রকল্প থেকে কেটে রাখার কোনো সুযোগ নেই। ফলে সরকারের এই সাড়ে ১০ কোটি টাকা এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, ‘কাজ করতে গেলে অনেক সময় এমন হয়। এ ঠিকাদারের (জি কে শামীম) অন্য একটি প্রকল্পে টাকা দিতে না পারায় এ কাজটি করা হয়েছিল। এখন এ টাকা সমন্বয় করার চেষ্টা চলছে।’ জি কে শামীমের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো সখ্য নেই।’ দুদকে থাকা মামলাটিও মীমাংসা হয়েছে বলেও দাবি করেন এ প্রকৌশলী।

Sharing is caring!