নাগরিক টিভির রিপোর্টই সত্য বলে প্রমাণিত:প্রাথমিক তদন্তে জানা গেলো লালমনিরহাটে গুজবেই প্রাণ গেলো সেই হতভাগা যুবকের

গতকাল নাগরিক টিভির ফেইসবুক পেজ এ লালমনিরহাটের ঘটনায় আমরা নিন্দা জানিয়ে একটি পোস্ট করেছিলাম এবং প্রশ্ন করেছিলাম এ বর্বরতার শেষ কোথায়। আমরা রিপোর্টটিতে বিবিসি এবং আমাদের নিজেদের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানিয়েছিলাম যে গুজবের কারণেই উত্তেজিত জনতার প্রহারে প্রাণ গিয়েছিলো হতভাগা জুয়েলের। অবশেষে আজ নিশ্চিত হওয়া গিয়েছে যে আমাদের রিপোর্টটি শতভাগ সত্য ছিল।

জানা গিয়েছে গতকাল বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের জামায়াত শেষে মুসল্লিরা মসজিদ ছেড়ে বের হয়ে যান। পেছনে পড়া অল্প কিছু লোকজনের চিৎকারে মুসল্লিরা ফিরে আসেন মসজিদে। পরে বাজারের ব্যবসায়ী ও বাজরে আসা লোকজন জড়ো হয়। উপস্থিত জনতার মধ্যে শোরগোল ওঠে। গুজব ছড়িয়ে পড়ে, গোয়েন্দা সংস্থার লোক পরিচয়ে দুই জন ব্যক্তি মসজিদে বোমা ও জঙ্গি আছে বলে তল্লাসি করার সময় কোরআন শরীফ অবমাননা করেছে।

জড়ো হওয়া লোকজনের মধ্য থেকে কয়েকজন এসময় দুইজনকে মারপিট শুরু করে। খবর পেয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হাফিজুল ইসলাম মসজিদে গিয়ে নানাভাবে মুসল্লিদের অনুরোধ করে ওই দুজনকে পাশের ইউপি কার্যালয়ে এনে একটি কক্ষে রাখেন। এদিকে আরো শত শত মানুষ জড়ো হতে থাকে।

খবর পেয়ে ইউপি চেয়ারম্যান আবু সাইদ নেওয়াজ নিশাদ পুলিশে খবর দেন। পুলিশ যেতে যেতে লোকারণ্য হয়ে পড়ে আশপাশের এলাকা। থানার ওসি সুমন কুমার মোহন্ত, ইউএনও কামরুন্নাহার, উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল কোন রকমে ইউপি কার্যালয়ের ভেতর ঢুকতে পারলেও অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে নিয়ে বের হতে পারেনি। বাইরে লোকজন কোরআন অবমাননাকারী আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যার জন্য ওই দুইজনকে তাদের হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবি জানায়। এক পর্যায়ে কলাপসিবল গেট ভেঙ্গে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। পুরো দেড় ঘণ্টা ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালায়। সংখ্যায় কম হওয়ায় পুলিশসহ ভেতরে থাকা লোকজন কুলিয়ে উঠতে পারেননি। সন্ধ্যার আগে আগে হাজার হাজার লোক আসে ইউপি কার্যালয়ে। এক পর্যায়ে বারান্দার একপাশের গ্রিল ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকে দুজনের একজনকে ছিনিয়ে মাঠের মধ্যে নিয়ে গলায় দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে টানতে টানতে ২শ মিটার দূরে নিয়ে যায়। রাস্তার ওপর ফেলে পিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

পুলিশ অপরজনকে নিয়ে কৌশলে ইউপি কার্যালয়ের দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে একটি ব্যাংকে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও ব্যাপক হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।

বুড়িমারী ইউপি চেয়ারম্যান এবং মেম্বররা জানান, প্রথম দফায় আসা লোকজনকে শান্ত করে আনা সম্ভব হয়েছিলো। কিন্তু সন্ধ্যার পর একটি গ্রুপ যোগ দেয়। মূলত এরাই বেশি উ-শৃঙ্খলতা দেখায়।

পাটগ্রাম থানার ওসি বলেছেন, যারা ঘটনা ঘটিয়েছে তারা প্রকাশ্যেই ঘটিয়েছে। তাদের সকলের ছবি এবং ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহে আছে। ইন্ধন ও উস্কানিদাতা সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

টানা ৫/৬ ঘণ্টা ধরে এই বীভৎস তাণ্ডব চলার পর রাতে র‍্যাব, ৩ প্লাটুন বিজিবি ও রিজার্ভ পুলিশ পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

জানা গেছেন, নিহত ব্যক্তির নাম শহিদুন্নবী জুয়েল। বাড়ি রংপুরের শালবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে পড়ালেখা শেষ করে রংপুরের ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে লাইব্রেরিয়ান হিসাবে চাকরি নিলেও বছরখানেক আগে বাধ্যতামূলকভাবে রিজাইন করানো হয়। ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক ও ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন বলে জানিয়েছেন পরিবার ও প্রতিবেশীরা। চাকরী না থাকাসহ নানা কারণে জুয়েল গত কয়েকদিন ধরে মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন বলে জানিয়েছে পরিবার।

আমরা নাগরিক টিভি আমাদের ফেইসবুক পোস্টটিতে দাবি করেছিলাম জুয়েল মানসিক ভারসম্যহীন, আমরা আরো দাবি করেছিলাম গুজবে তার প্রাণ গিয়েছে। আমাদের দুটি দাবিই যে সত্য ছিল এবং এখানে কোরান অবমাননার কোনো ঘটনা যে সেখানে ঘটেনি সেটি আজ প্রমাণিত হল। অথচ আমরা দেখলাম আমাদের পোস্টটির কমেন্ট সেকশনটিতে কিছু উগ্রপন্থী, ধর্মান্ধ মানুষেরা মানবিকতাবোধ হারিয়ে নানাভাবে এমন বর্বরোচিত একটি হত্যাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছিলেন। আমরা ধিক্কার জানাই আপনাদের এই বর্বর মানসিকতাকে।

Sharing is caring!