নাগরিক টিভি EXCLUSIVE : বেসামাল অবস্থায় হাসিনা প্রশাসন: ৯৭ জন আমলার রহস্যজনক গতিবিধি

যুক্তরাষ্ট্রে অক্টোবর সারপ্রাইজ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে, সেই কথাটি বর্তমানে বাংলাদেশের শেখ হাসিনার প্রশাসনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে। এই অক্টোবর মাসে কিছু একটা ঘটছে বা ঘটবে অথবা কিছু একটা ঘটার প্রেক্ষিত তৈরী হবে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। নাগরিক টিভির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সরকারের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই সেই রকমই ইঙ্গিত দিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক সরকারি আমলাই বলেছেন প্রশাসনে এক ধরণের ভয়-ভীতি এবং শঙ্কা কাজ করছে যার ফলে সিনিয়র অনেক মন্ত্রীই বর্তমানে অনেকটাই নীরবতা পালন করছেন এবং মিডিয়াকে এড়িয়ে চলছেন।

যে রহস্যজনক অবস্থানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা রয়েছেন তা কদিন আগেও ভাবা যায়নি। কদিন আগেও বেশ অহমিকার সুরে যারা কথা বলতেন তারাও বেছে নিয়েছেন মৌনতা বা চলে গিয়েছেন পর্দার অন্তরালে । তারা কে কোথায় কী করছেন, এ-সংক্রান্ত তথ্যের বড় আকাল। তাদের সবকিছুতেই লুকোচুরি। দেশ ও সরকারের এই ফ্যাক্টর ব্যক্তিদের কেউ কেউ দেশে না বিদেশে-এ নিয়েও গুঞ্জনের শেষ নেই। একসময় তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মঞ্চ আলোকিত করতেন। গত মাস কয়েক সেটাও নেই। দল বা অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেউ তাদের দাওয়াতও দেন না। দলের হাইকমান্ডের নির্দেশেই এই বৈপরীত্য। প্রকাশ্য দৃশ্যপটে সম্প্রতি আছেন মাত্র দুজন।

একজন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। আরেকজন বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। বাকিদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আগের মেয়াদেও নিজ নিজ পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। প্রধানমন্ত্রী রুলস অব বিজনেস, ১৯৯৬ এর রুল ৩বি (১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তাদের এসব পদে বসানো হয়। তারা মন্ত্রীর পদমর্যাদা, বেতন-ভাতাদি ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত। ক্ষেত্রবিশেষে তারা মন্ত্রীদের চেয়েও ছিলেন ক্ষমতাবান। শেখ হাসিনাকে বারবার ক্ষমতায় আনা এবং নানা শঙ্কার মধ্যেও ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার পেছনে তাদের ক্যারিশমা নিয়ে রাজনীতির বাজারে বহু গালগল্প রয়েছে।

সময়ের ব্যবধানে সব গল্প পানসে হয়ে গেছে। উপরন্তু তাদের কারো কারো অদম্য ক্ষমতাচর্চা, অর্থ হাতানো, ভাগ-বাঁটোয়ারা, অর্থ নিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে বিরোধের এন্তার ঘটনা ঘটছে। স্বনামে-বেনামে, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ নিকটজনদের বিশাল ব্যবসা দেওয়া, কমিশনের ভাগ ইত্যাদি নিয়েই মূলত এ বিরোধ। এই সঙ্গে তারা মাখিয়ে ফেলেছেন বিভিন্ন বাহিনী-সংস্থার প্রধানসহ পদস্থ কর্মকর্তাদের। এসবের বেশ কিছু অডিও-ভিডিওর স্তূপ জমা পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। এগুলোর কোনো কোনোটি প্রধানমন্ত্রীর জন্যও বিব্রতকর। কারণ কোনো কোনো ঘটনার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্যদের নামও তাদের মুখে উচ্চারিত। যার দুয়েকটি ঘটনাচক্রে এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

একসময় মন্ত্রীসহ দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ কয়েক উপদেষ্টার নানা অপকর্ম ও বিভিন্ন মহলে যাতায়াতের অভিযোগ অবহিত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দরবারে। তখন তা আমল পায়নি। পরে ধীরে ধীরে কিছু অভিযোগের প্রমাণ মিলতে থাকে। এর জেরে ক্রমে উপদেষ্টাদের ক্ষমতা খর্ব করতে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দুয়েকজন ছাড়া তাদের তেমন কাজ নেই। দুয়েকজন উপদেষ্টা তাদের নিজেদের মতো করে কিছু কিছু কাজ খুঁজে নিচ্ছেন। কিন্তু বাকিরা বসে এবং রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই সময় কাটাচ্ছেন। চেষ্টা-তদবির করেও প্রধানমন্ত্রীর দেখা পান না তারা। কথা বলার সুযোগও হয় না। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নাক গলাতে গেলেই বাধার মুখে পড়ছেন। মাঝারি সারির নেতারাও তাদের পাত্তা দেন না। এর পেছনে প্রধানমন্ত্রীর সংকেত রয়েছে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র। এইচ টি ইমামের নাম ধরে ফরিদপুরের এমপি শেখ পরিবারের সদস্য নিক্সন চৌধুরীর সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু বক্তব্য তা আরো খোলাসা করে দিয়েছে।

পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এইচ টি ইমাম, গওহর রিজভী, তৌফিক-ই-ইলাহী নিজেদের গুটিয়ে নিতে থাকেন। অনেকটা চুপিসারে দেশের বাইরেও গেছেন কয়েকবার। আবার ফিরেছেন চুপিসারে। তাদের এই ডুবসাঁতার প্রধানমন্ত্রীর কাছে গোপন থাকছে না। আবার ফলাও করে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অ্যাকশনেও যাওয়া যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ছকে বাঁধা পড়ে উপদেষ্টারাও নাক ডুবিয়ে পড়ে আছেন। কোনো পাল্টা অ্যাকশনে গেলে ডুবতে হতে পারে নিজেদেরও। তার ওপর এই উপদেষ্টাদের খাস সেবক সরকারের উচ্চপদস্থ অন্তত ৯৭ জন কর্মকর্তার গতিবিধিতে কিছু ইঙ্গিত রয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় উপদেষ্টাদের হয়ে বিশাল অর্থনৈতিক ডিলে সম্পৃক্ত এই কর্মকর্তারা। চরম কোনো পরিণতির আশঙ্কা থেকে বাঁচতে নানা জায়গায় দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াচ্ছেন এই আমলার

Sharing is caring!