সত্যিই কি নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প?

লিখেছেন নাজমুস সাকিব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনের আর মাত্র ৩০ দিন বাকি। নির্বাচনী প্রচারণা বেশ জোরেশোরেই চলছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জো বাইডেন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প এর মুখোমুখি বিতর্কে এটা প্রতীয়মান হয়েছে দুজনার কেউই কাউকে ছেড়ে কথা বলবেন না! অর্থাৎ একটি জম্পেশ এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচন আমরা দেখতে যাচ্ছি সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! কিন্তু একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে বাঁধ দিয়েছে ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের করোনা আক্রান্তের সংবাদটি।

গত ২৪ ঘন্টায় শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, সমগ্র বিশ্ব মিডিয়ার সংবাদের শিরোনামটি দখল করে রেখেছে ট্রাম্পের করোনা আক্রান্তের সংবাদটি। নির্বাচনের প্রচারণা কাজের সংবাদের চেয়েও এখন বেশি করে আলোচিত হচ্ছে ট্রাম্প এর কিছু হলে দায়িত্ব কে গ্রহণ করবে , ট্রাম্প এর শারীরিক জটিলতা কি কি থাকতে পারে, ৭৪ বছর বয়স্ক ট্রাম্প কি পারবেন করোনা জয় করে নির্বাচনের মাঠে আবার প্রত্যাবর্তন করতে, ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ।

যুক্তরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত হয়ে ইতিমধ্যে দুই লক্ষ আট হাজার মানুষ মারা গিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এর বইতে প্রমান সহ উপস্থাপিত হয়েছে করোনা মোকাবেলায় ট্রাম্পের অব্যবস্থাপনার চিত্র। উডওয়ার্ড ট্রাম্পের সাথে তার এ সংক্রান্ত একটি অডিও ক্লিপ প্রকাশ করেছেন যা থেকে স্পষ্টভাবে শোনা গিয়েছে ট্রাম্পের ভাইরাস এর ভয়াবহতা লুকানোর বিষয়টি। ট্রাম্পের অত্যন্ত আস্থাভাজন সমর্থকেরা ছাড়া অধিকাংশ ভোটার বিষয়টিকে জনগণের সাথে এক ধরণের প্রতারণা বা তথ্য গোপন হিসেবে দেখছেন, যা একজন প্রেসিডেন্টের কাছে কখনোই কাম্য না।

কিন্তু করোনা মোকাবেলায় চরম অব্যবস্থাপনা সত্ত্বেও ট্রাম্প একটি শক্তিশালী অর্থনীতি বজায় রাখতে পারায় নিন্দুকেরা খুব বেশি সুবিধা করতে পারছিলো না। মাস্ক ব্যবহারে অনীহা, মেডিকেল এক্সপার্টসদের সাথে প্রকাশ্যে দ্বন্দে জড়ানো, সদ্য সমাপ্ত বিতর্কে জো বাইডেনকে মাস্ক পড়ার বিষয়ে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য, ইত্যাদি নানা ধরণের বিতর্কিত কার্যকলাপ সত্ত্বেও ভোটের ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে না এমনটিই মনে হচ্ছিলো কারণ ট্রাম্পের সমর্থকেরা ট্রাম্পের বিতর্কিত কার্জকলাপগুলোকে মেনে নিয়েই তাকে ভোট দিয়েছিলো বা হয়তো এবারও দেবে এমনটিই কেউ কেউ ধারণা করেছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের করোনা আক্রান্তের সংবাদটি পুরো ব্যাপারটিকেই নতুন করে ভোটারদের ভাবতে বাধ্য করছে। ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদের বিষয়টিকে ভালোবেসে যারা তাকে গত চারটি বছর ধরে নানা বিতর্ক সত্ত্বেও সমর্থন দিয়ে আসছিলেন, তারাই বিবেকের কাছে প্রশ্ন করছেন করোনা মোকাবেলায় ট্রাম্প প্রশাসন জনগণকে সঠিক তথ্য না দিয়ে এত বেশি সংখ্যক মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেবার দায় এড়াতে পারে কি? তাছাড়া যিনি মেডিকেল সাইন্সকে অবজ্ঞা করে নিজেই করোনা আক্রান্ত হলেন, তিনি কিভাবে মেডিকেল সাইন্স এর আলোকে জনগণকে সুরক্ষিত রাখবেন? অর্থাৎ সামগ্রিক অবস্থাপনার পুরো দায়ভার এখন ট্রাম্পের ঘাড়েই পড়ছে কারণ তিনি শুরু থেকেই এই ভাইরাস এর বিষয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করে আসছিলেন।

অপরীক্ষিত ঔষধ হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন সেবন করতে ট্রাম্প মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল, তাছাড়া জীবাণুনাশক শরীরে প্রবেশ করিয়ে করোনা মোকাবেলায় সফলতা আসতে পারে এমন ধারণা দেবার চেষ্টাও করেছিলেন। অর্থাৎ পুরো বিষয়টিতে তার অদক্ষতা এবং নানা সময়ে নানা বিতর্কিত মন্তব্যগুলো এখন ঘুরে ফিরে আবার আলোচনায় চলে আসছে যা তার পুণঃনির্বাচিত হবার সম্ভাবনাকে একদম উড়িয়ে দিচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে।

২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জয়ী হলেও তখনকার বাস্তবতা এবং বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২০ সালের আমেরিকাতে বর্ণবাদ একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে যা নানা সময়ে ট্রাম্প প্রভাবিত করেছেন বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা। শুধুমাত্র শক্তিশালী অর্থনীতির উপর ভর করে ট্রাম্প দ্বিতীয় বার নির্বাচিত হলেও হতে পারতেন এমন ধারণা যারা রেখেছিলেন তারাও এখন বেশ সংশয়ে আছেন।

ট্রাম্পের করোনা আক্রান্তের সংবাদটি নির্বাচনে জয় পরাজয়ে একটি বড় ভূমিকা রাখবে বলেই ধরে নেয়া যায়। করোনা আক্রান্ত ট্রাম্প নির্বাচনী দৌড় থেকে ছিটকে গেলেন নাকি তার সমর্থকদের সহানুভূতিতে আরো চার বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন সেটা জানতে হলে আমাদের আরো একটি মাস অপেক্ষা করতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট হবার পর ট্রাম্প বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ একটি সময় অতিবাহিত করছেন এটা নিঃসংকোচে বলে দেয়া যায়। ট্রাম্প যদি আগামী দুসপ্তাহের মধ্যে পুরোপুরি সুস্থ না হতে পারেন, এবং সুস্থ হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় শেষ দুসপ্তাহে মাঠে না নামতে পারেন, তাহলে তার সমর্থকেরাও তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন বলেই আমার বিশ্বাস।

লেখক: হেড অফ নিউস, নাগরিক টিভি

Sharing is caring!