সরকার ও পুলিশের আচরণে ক্ষুদ্ধ মানুষজন

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:
যতো দিন গড়াচ্ছে বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে ততই ঘন কালো মেঘের আস্তরণ বাড়ছে। ভোটারবিহীন সরকার ও তাদের অনুগত পুলিশ বাহিনীর আচরণে ক্ষুদ্ধ মানুষজন। খুন, গুম ও হয়রানির শিকার হলেও দেশের মানুষ এখন থানায় যেতেও ভয় পান। এমনকি হামলার শিকার হলেও বিষয়টি চেয়ে গিয়ে নিজেই সংগ্রাম করে জয়ী হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত এখন দেশের কোটি কোটি মানুষ।

বাংলাদেশে এখন স্বৈরশাসন চলছে। এক ব্যক্তির শাসনে অতিষ্ট নাগরিক। এমনকি ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের কঠোর সমর্থকরাও বিরক্ত ও তিক্ত। তারাও চাইছেন দেশে একটা বড় পরিবর্তন আসুক। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যেমনে বিরোধী মতের মানুষজন নাস্তানাবুদ হচ্ছেন তেমনি সরকার দলীয় সমর্থকরাও নাজেহাল। এমনকি তারাও খুন, গুমের শিকার হচ্ছে।

পল্লবীর আলীনগর এলাকায় নিজের বাপদাদার সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে ঈদের পরদিন নির্মমভাবে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয় কৃষক লীগের কর্মী সাহিনুদ্দিনকে। ওই সময় তার ৭ বছরের ছেলে পাশেই দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্য দেখেছে। যারা সাহিনুদ্দিনকে হত্যা করেছে তারা সকলে লক্ষীপুরের সাবেক এমপি এম এ আউয়ালের ক্যাডার বাহিনী। জানা গেছে, আউয়াল পল্লবী এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। নিজের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে ৮টি গ্রুপ দিয়ে চালাতেন তার রাম রাজত্ব। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর ও খুন করে গুম করতেন। তবে সম্প্রতি সাহিনুদ্দিন হত্যার পর তার রাজ্যে কিছুটার হলেও ভাটা পড়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের সাবেক একজন এমপির হত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকায় অনেকে অবাকও হয়েছেন। তবে কেউ কেউ বলছেন, সাবেক এমপি আউয়াল যা করেছেন তাতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে। কারণ তারা তো জবর দখল ও হামলায় বিশ্বাসী একটি ফ্যাসিবাদী দল।

দেশে এখন দিন দিন ভোটারবিহীন জনপ্রতিধিদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে মানুষজন। সম্প্রতি গত ১ জুন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সুন্দরবন সংলগ্ন কয়রা উপজেলার দশহালিয়ায় বাঁধ মেরামতে নিয়োজিত মানুষের রোষের মুখে পড়েন স্থানীয় সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু। কপোতাক্ষ নদের পাড়ে বাঁধের একটি ভাঙা অংশ এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে মেরামতের কাজ করছিলেন। তারাই এমপি বাবুকে দেখে ক্ষেপে ওঠেন, চিৎকার করেন, কেউ কেউ কাদা ছুঁড়ে মারেন। পরে তারা ফিল্মি স্টাইলে লঞ্চ থেকে যাত্রী নামিয়ে বেধড়ক মারধর করেন এলাকাবাসী। এই কাঁদা ছোড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই সময় তার সঙ্গে কয়রা থানার ওসিসহ আরো কয়েকজন থাকলেও কোন কাজ হয়নি। উল্টো তারা ভয়ে সেখান থেকে জানে পালিয়ে আসেন।

এসব ঘটনায় রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, মানুষ যখন তাদের কাঙ্খিত শাসন পায় না, তখন আইন, আদালত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাষ্ট্র, সরকারের ভূমিকা নিয়ে এক ধরনের সন্দেহ, হতাশা ও ক্ষোভ মানুষের মধ্যে হয়। দেশকে রক্ষা করতে হলে, নাগরিকের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হলে, ন্যূনতম আইনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাধা দূর করতে হবে।

এদিকে দিন দিন পুলিশ বাহিনীর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস জিরোতে নামছে। কারণ হিসেবে লোকজন বলছেন, পুলিশ এখন বাংলাদেশের ভোটারবিহীন সরকারের একটি অনুগত বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। থানায় গেলে টাকা ছাড়া কোন কাজই হয় না। মামলার পর আসামী ধরার জন্য পুলিশকে নানা ভাবে তাগাদা দিলেও তারা শুনেনা। উল্টো আসামীদের পক্ষ নিয়ে বাদীকে গ্রেফতার করে। এমন ঘটনা ঘটেছিল পল্লবীতে নিহত সাহিনুদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে। সাবেক এমপি এম এ আউয়ালের ক্যাডার বাহিনীর হাতে নিহত সাহিনুদ্দিনের মা আকলিমা বেগম বলেন, আমি আউয়ালের ফাঁসি চাই। সে আমার ছেলেকে তার লোকজন দিয়ে এর আগেও মারছে কিন্তু উল্টো মামলা করে দুই ছেলেকে জেল খাটালো।

জানা গেছে, আউয়ালের পক্ষ নিয়ে দীর্ঘদিন থেকে কাজ করছিল পল্লবী থানা পুলিশ। ফলে সাহিনুদ্দিন হত্যার আগে কোন ব্যবস্থা না নেওয়া ও অবহেলার কারণে সম্প্রতি ওই থানার ওসি কাজী ওয়াজেদকে বদলি করা হয়েছে।
গত কয়েক বছর আগে পল্টন এলাকার বন্ধু হোটেলের ম্যানেজার হাসানকে ডিবির সদস্যরা ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে জাল টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে মামলা দেয়। সেই মামলায় এখনো ঝুলছেন সেই হাসান। যদিও সিসি টিভির ফুটেজে সেই প্রমাণ মিলেছে কিন্তু এখনো কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি জড়িতের বিরুদ্ধে। উল্টো তাদের রক্ষার জন্য নানা কৌশল করছে পুলিশ। এসব কারণে দেশে এখন পুলিশের প্রতি কোন আস্থা ও বিশ্বাস নেই দেশের অধিকাংশ মানুষের।
দেশের মানুষ মনে করে, পুলিশ একটি দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর বাহিনী। সেখানে গেলে মানুষ প্রতিকারের চেয়ে হয়রানি হয় বেশি। আর প্রতি পদে পদে তো টাকা গোনার বিষয়টি আছেই।

Sharing is caring!