আদাবরে চার কারণে বেড়েছে করোনা

সাবিত মোস্তফা:
আদাবর পিসিকালচার হাউজিং সোসাইটির ‘খ’গেট হয়ে প্রবাল হাউজিংয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়লো রিক্সা জট। তখন সকাল ১১ টা। প্রতিটি রিক্সায় যাত্রী পুরুষের চেয়ে নারীই বেশি। তবে রিক্সা চালক কি আরোহী কারও মুখেই ছিল না কোন ধরনের মাস্ক। এ সড়কের ১০ থেকে ১৩ নং রোড। প্রায় আধা ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বিভিন্ন দৃশ্য অবলোকনের ফাঁকে যা পাওয়া গেল তা হলো, সড়কে ছুটে চলা ১১৩ জন রিক্সা চালকের মধ্যে মাত্র ৯৮ জন ও ৯০ শতাংশ যাত্রীর মুখে মাস্ক ছিল না।  প্রতিটি খাবার হোটেলে মানুষের ভীড়, বিরিয়ানী দোকানগুলোতে বসেই খাবার খাচ্ছেন অনেকে,  চায়ের দোকানে আড্ডা থেকে মুদি এমনকি মোড়ে মোড়ে ভাসমান সবজি ও মৌসুমী ফলের দোকানীর মুখেও মাস্কের বালাই নেই। ভাবখানা এমন যেনো করোনাই নেই! মাস্কবিহীন অবস্থাতে তারা দেদারছে তাদের কাজকর্মও চালিয়ে যাচ্ছেন।
শুধু তাই নয়, এখানকার হাতে গোনা দুই একটা বাসা বাড়ি ছাড়া কোন বাসার গেটে হ্যান্ডস্যানিটাইজার, সাবান ও পানির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। অথচ রোববার স্বাস্থ্যবিভাগ ঘোষণা দিয়েছে, রাজধানীর আদাবরে ৪৪ এবং রুপনগর এলাকার ৪৬ শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত। এই খবর আদাবরের অধিকাংশ বাসিন্দারাও জানেন বলে তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল।  

তবে এই এলাকায় অধিকাংশ মানুষের মাস্ক ব্যবহারে অনিহা, বাসা বাড়িতে সুরক্ষা সামগ্রী না থাকার বিষয়টি খোদ ওই এলাকার কাউন্সিলর থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসনও স্বীকার করলেন। আর এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অধিকাংশ লোকজন মাস্ক ব্যবহার না করা, বাসা বাড়িতে বুয়াদের অবাধ প্রবেশ এবং সন্ধ্যা হলে মোড়ে মোড়ে চায়ের দোকানে আড্ডা এই এলাকায় করোনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

৩০ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবুল কাসেম নাগরিকটিভি ডটকমকে বলেন, আমরা মাইকিং করে লোকজনকে সতর্ক করছি। তবে এটা সত্য এলাকার মানুষে কম মাস্ক ব্যবহার করে। আরও সতর্ক করতে রাতে একটি টিম গঠন করা হচ্ছে। দ্রুত তারা কাজ শুরু করবে। এজন্য পুলিশেরও সহায়তা প্রয়োজন। অধিকাংশ বাসা বাড়িতে সুরক্ষা সামগ্রী নেই তা তিনিও নাকি জানেন। কিন্তু এ নিয়ে কবে থেকে কাজ শুরু করবেন তার উত্তর দিতে পারেননি।

আদাবর থানার ওসি কাজী শাহিদুজ্জামান বলেন, আমাদের যতোটুকু ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সে অনুপাতে আমরা কাজ করছি। আরও কড়া নির্দেশনা আসলে আরও কঠোরভাবে কাজ করা হবে।

রাজধানীর পশ্চিমে ২ দশমিক ৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা আদাবর। এখানে যেমন উচ্চবিত্ত  ও মধ্যবিত্তের মানুষের বাস। তেমনি খেটে খাওয়া নিম্নবিত্ত মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ফলে এখানকার অধিকাংশ নিম্নবিত্ত মানুষের পেশা হলো-পোশাক ও এ্যাম্বোডারী কারখানায় কাজ করা, ফুটপাতে ভাসমান খাবার ও সবজির ব্যবসা, বাসা বাড়িগুলোতে কাজের বুয়ার কাজ অন্যতম। বাকীরা চাকরী আর ব্যবসা করেন।

সোমবার এ এলাকার প্রতিটি সড়ক, অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে, সব কিছু আগের মতোই চলছে। করোনা নিয়ে কারো মাঝে তেমন কোনো সচেতনতার লেশ মাত্র নেই। প্রতিটি গলিতে চলছে আড্ডা ও গল্পগুজব। বিশেষ করে নারীদের সকাল ১১ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত রিক্সায় ছোটাছুটি। রাস্তায় পুরুষের চেয়ে নারী ছিল বেশি। অধিকাংশ নারী বাজার, মার্কেট ও প্রয়োজনে বের হয়েছেন বলে তাদের দাবি ও ভাষ্য। এ এলাকার রিক্সাচালক, দোকানী, ভাসমান হকার, সবজি বিক্রেতা, চা, মুদি ও মাছ মাস বিক্রেতা দোকানী ও রিক্সা চালকের মুখে মাস্ত পরা লক্ষ্য করা যায়নি।

সিদ্দিক নামের এক রিক্সা চালক তো জানালেন, তিনি নাকি জানেনই না ওই এলাকায় করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ওই সময় তার মুখেও মাস্ক ছিল না।

এছাড়াও ফার্মেসীসহ বিভিন্ন দোকানগুলোতে কোনো সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এমনকি কিছু সুপারশপে সুরক্ষা ব্যবহার করা হলেও স্বাস্থ্যবিধির বালাই ছিল না। মানা হয়নি কেনাকাটার নিয়মও। অধিকাংশ বাসা বাড়িতে প্রবেশের আগে সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবস্থা নেই।

পিসিকালচার হাউজিংয়ের ১২ রোডের বায়তুস সালমা নামের বাসার কর্মচারী রুবেল জানান, তার বাসার সকলে উপরে উঠে হাত পরিস্কার করেন। নিচে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা নেই।

আজ সারাদিন প্রবাল হাউজিং এলাকার সড়ক, অলিগলিতে ছুটে চলা মানুষের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল নারী। যাদের হাতে ছিল বাজার ও শপিয়েংয়ের ব্যাগ।

এলাকাবাসী জানালেন, এই এলাকার ৬, ১০, ১৩, ১৪ ও ১৭ নং  রোড ছাড়াও আদাবর বাজারের মানুষের ভীড় বেশি। এসব এলাকায় সব সময়ে লোক সমাগম থাকে। এছাড়াও রাত ১২ থেকে ১ পর্যন্ত চায়ের দোকানগুলোতে লোক গমাগম থাকে। তাদের কেউ কোন ধরনের মাস্ক ব্যবহার করেন না। আদাবর বাজারটিতে সবচেয়ে করোনা ঝুঁকি বেশি থাকলেও ভীড় জমে বেশি ৯ টা থেকে বিকেল ৪ টা পর্যন্ত। এ বাজারে পুরুষের তুলনায় নারীরাই বেশি বাজার করেন। সকালে বাজারটি লোকে লোকারন্য হয়ে যায়। স্বাস্থ্যবিধি তো কোন বালাই নাই বলে জানালেন কলেজ ছাত্র সুজন।

একই চিত্র বায়তুল আমান হাউজিং, মুনসুরাবাদ এলাকা, শেখেরটেক, নবোদয় হাউজিং, শ্যামলী হাউজিং ১ম প্রকল্প এলাকা, জনতা হাউজিং, সুনিবিড় হাউজিং, প্রভাতী হাউজিং থেকে শ্যামলী হাউজিং ২য় প্রকল্প পর্যন্ত।

কথা হচ্ছিল পিসিকালচার সোসাইটির ১০ নং রোডের বাসিন্দা নিপুন আকতারের সাথে। এ এলাকায় গত ১০ বছর ধরে বসবাস করছেন তিনি। রোববার রাতে শুনেছেন আদারবে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। এরপরও তিনি আজ সোমবার বাজারের জন্য বের হয়েছিলেন। তখনো তার হাতে সবজি ও মাছের ব্যাগ ঝুলছিল। কেন এই পরিস্থিতিতে বের হলেন প্রশ্ন করতে তার ঝটপট জবাব, ‘কি করবো ভাই! স্বামী চাকরীতে যায়।’

তার মতো এ এলাকার প্রতিটি বাসা বাড়ির নারীরা সকালে ও দুপুরের দিকে বাজার করতে বের হন। তবে সকালে ভীড়টা বাজারে বেশি থাকে বলেও তিনি যোগ করেন। তিনি মনে করেন, তাদের কম বের হওয়া দরকার কিন্তু সেটি সম্ভব হচ্ছে না।

১৩ নং রোডের মাথায় থাকা রোমান টাওয়ারের কেয়ারটেকার আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন, এলাকার অধিকাংশ মানুষের মুখে মাস্ক না থাকা, সড়ক গুলোতে মানুষের যাতায়াত বেশি এবং মোড়ে মোড়ে থাকা দোকানগুলোতে আড্ডা জমে থাকা সেই এলাকায় করোনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

তিনি জানান, তার টাওয়ারে প্রায় অর্ধ শত পরিবার বাস করে। প্রতিটি ফ্লাটের পুরুষরা সকালে অফিস বের হয়ে যান। ফলে অধিকাংশ সময়ে নারীরাই বাজার সদাই করেন। ১০ নং রোডের ব্যবসায়ী লুৎফর রহমানের মনে করেন, আদাবরের অধিকাংশ বাসা বাড়ি বুয়া নির্ভর। এই বুয়াদের অধিকাংশই সারাদিনে তিন থেকে চারটি বাসা বাড়ীতে কাজ করেন। ফলে তাদের মাধ্যমেও বাসা বাড়িগুলোতে করোনা ছড়াচ্ছে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, এই বুয়া সার্ভিসটা আপাতত বন্ধ রাখা প্রয়োজন।

এ এলাকায় গড়ে ওঠা দুটি পোশাক ও অর্ধ শত অ্যাম্বোডারী কারখানায় ৮০ শতাংশ নারী কাজ করেন। গতকাল দুপুর ১ টার দিকে কাজের বিরতীর সময় শ্রমিকরা বাসায় ছুটছিল। অধিকাংশ নারী শ্রমিকদের মুখেই মাস্ক ছিল না।

জানতে চাইলে নারী শ্রমিক সালমা,  রুমানা, রুবিনা ও আকতারা বলেন, কিসের করোনা, আল্লাহ রক্ষা করবে। চায়ের দোকানী আড্ডা দেয়া রুবেল জানালেন, বাহিরে বের হওয়া যাবে না জানি, কিš‘ চা খেতে বের হলাম। 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদ মনে করেন, সেই এলাকায় জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী  ও মার্চ মাসে কমিউনিটি সেন্টার ও বাসা বাড়িতে বেশি বিয়ে সাদী ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লোক সমাগম হয়েছে। এছাড়াও মিছিল মিটিং, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে লোক সমাগমের বেশি হওয়ার কারণেও করোনা সংক্রামন এবং আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। 

Sharing is caring!