করোনা সহায়তার ১২৫০ কোটি টাকা হরিলুট

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:
গত বছর করোনায় কর্মহীন ৫০ লাখ দরিদ্র মানুষদের তালিকা করেছে ভোটবিহীন সরকার। কথা ছিল এই মানুষগুলোর প্রত্যেকে পাবেন আড়াই হাজার টাকা করে। এ টাকা তাদের মোবাইলের বিকাশ নাম্বারে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকার সবটাই মেরে খেয়েছেন আওয়ামীলীগ নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সব মিলে এ আয়োজন যেন ছিল হরিলুটের। শুধু কি তাই, এ টাকা প্রতিটি মানুষের কাছে পৌছে দেয়া বাবদ খরচ ধরা হয়েছিল আট কোটি টাকা। সেই টাকাও গায়েব হয়ে গেছে।
ভোটবিহীন সরকারের প্রশাসন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ২২ লাখ ৮৬ হাজার ৫২৮ জনের তথ্য নানা ধরনের অসংগতিতে ভরা। ৪ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিন হাজারের মতো সরকারি কর্মচারী ও সাত হাজারের মতো পেনশনভোগী রয়েছেন। ৫৫৭ জনের নাম রয়েছে, যাদের সঞ্চয়পত্র কেনা আছে ৫ লাখ টাকারও বেশি করে। ৮ লাখ ৭৯ হাজার ৩৫০ জনের তালিকা নতুন করে করতে হবে।
এই টাকা পাওয়ার তালিকায় ছিলেন, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক, পোলট্রি খামারের শ্রমিক, বাস-ট্রাকের শ্রমিক, হকারসহ নানা পেশার মানুষ। তাদের এই সহায়তা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অর্থাৎ নগদ, বিকাশ, রকেট ও শিওরক্যাশের মাধ্যমে পাওয়ার কথা ছিল। নগদ ১৭ লাখ, বিকাশ ১৫ লাখ, রকেট ১০ লাখ এবং শিওরক্যাশ ৮ লাখ মানুষের কাছে টাকা পৌঁছানোর দায়িত্ব পেয়েছিল।
আরও জানা গেছে, গত বছরের ঘটা করে ভোটবিহীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই টাকা বিতরণের উদ্বোধন করেন। এর আগে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) নেতৃত্বে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) তত্ত্বাবধানে একটি তালিকা করা হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল অনিয়ম ও অসংগতিতে ভরা। ফলে সুফল পায়নি দরিদ্র মানুষেরা। এই টাকার পুরোটাই লুট হয়েছে।
নাগরিক টিভি ডটকমের অনুসন্ধ্যানে জানা গেছে, এই টাকা যাদের পাওয়ার কথা ছিল, তারা পাননি। উল্টো জনপ্রতিনিধির আত্মীয়, আওয়ামীলীগ নেতা, তার পরিবারের সদস্য, ভাইবোনেরা মিলে এ টাকা মেরে খেয়েছেন। ভুয়া নাম, ফোন নাম্বার দিয়ে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। আর এই তালিকা খুব গোপনেই করা হয়েছিল যাতে দরিদ্র মানুষেরা টেরও না পান। কিন্তু তা গোপন থাকেনি।
এই টাকা মেম্বার ও চেয়ারম্যানের আত্মীয়স্বজন ছাড়াও পাঁচ লাখ টাকা সঞ্চয় জমান এমন আওয়ামী লীগের কর্মীও পেয়েছেন। যারা বিভিন্ন সময়ে ভোটবিহীন সরকারের নানা সুযোগ সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন তারাও বাদ যাননি এ টাকা নিতে। শুধু কি তাই, পেয়েছেন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীও। অথচ তাদের বেতন করোনায় সবার আগেই অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল। তারপরও এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীরা এই টাকায় ভাগ বসিয়েছিলেন। এসব তথ্য খোদ উঠে এসেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের এক অবস্থানপত্রেও। গত বছর অর্থ বিভাগের এক অবস্থানপত্রে দাবি করা হয়েছিল, ৫০ লাখের মধ্যে ৩৪ লাখ পরিবার এখনো টাকা পায়নি। অথচ তালিকাটি করা হয়েছিল ডিসিদের নেতৃত্বে এবং ইউএনও তত্ত্বাবধানেই।
তথ্য যাচাই করে ৫০ লাখের তালিকা থেকে অন্তত ৪ লাখ ৯৩ হাজার ২০০ জনকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানায় অর্থ বিভাগ। তাদের মধ্যে তিন হাজারের মতো সরকারি কর্মচারী ও সাত হাজারের মতো পেনশনভোগী রয়েছেন। অর্থ বিভাগ দেখেছে, তালিকায় এমন ৫৫৭ জনের নাম রয়েছে, যাঁদের সঞ্চয়পত্র কেনা আছে পাঁচ লাখ টাকারও বেশি করে। আবার এক লাখেরও বেশি লোক আছেন, যাঁরা অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকে ইতিমধ্যে সুবিধা পাচ্ছেন। আর প্রায় তিন লাখ ব্যক্তি রয়েছেন, যাঁদের একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পথশিশু, ইমাম, ভবঘুরে, ভিক্ষুক, গৃহিণী, বেদে, হিজড়াদের নাম রয়েছে তালিকায় অন্তত ৮০ হাজার জনের।

এই সংখ্যার মধ্যে ৮ লাখ ৩০ হাজার জনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বা স্মার্ট কার্ডের বিপরীতে নিবন্ধনকৃত মোবাইল নম্বর নেই। প্রায় আট লাখের এনআইডি বা স্মার্ট কার্ডের নম্বর ও তাতে দেওয়া জন্ম তারিখের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে থাকা তথ্যের কোনো মিল নেই।
এ ছাড়া ৬ লাখ ৩৮ হাজারের মোবাইল নম্বর এনআইডির বিপরীতে দেওয়া মোবাইল নম্বর থেকে আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট পেশা নেই অর্থাৎ গৃহিণী, বস্তিবাসী, বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা রয়েছেন আরও ১৯ হাজার জন। ১১ ডিজিটের মোবাইল নম্বরের মধ্যে অনেকে কমবেশি ডিজিটও উল্লেখ করেছেন।

তালিকার পরও ২৩ লাখের তথ্যই অসংগতিপূর্ণ ছিল। যা ভোটবিহীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী সংশোধন করতে বলেছিলেন। কিন্তু কাজ হয়নি। পরে এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে ভোটবিহীন সরকারের প্রশাসন বেকায়দায় পড়ে যায়। বাধ্য হয়ে লোক দেখানোর জন্য আবারও প্রশাসনকে নির্দেশ দেয় নতুন করে তালিকা বা আগের তালিকা যাচাই বাছাই করার জন্য। কিন্তু যে লাউ সেই কদু। কোন কাজ হয়নি। আজও মেলেনি সেই টাকা। যাদের নাম্বার ও নাম নেয়া হয়েছিল তারা আজও বিভিন্ন জনপ্রতিনিধির প্রশ্ন করেন, ভাই টাকাটা কি আসছে? কবে আসবে? কিন্তু তাদের এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না কেউ।
এ বিষয়ে গত বছর একটি গণমাধ্যমের কাছে ভোটবিহীন সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বলেছিলেন, তালিকাটি ভালোভাবে করা যায়নি। একটু দেরি হোক, তবু প্রকৃত লোক টাকাটা পাক, এটাই আমাদের চাওয়া। এখন কোথাও সমন্বয়ের কোন ঘাটতি নেই।

তৃনমুলের অভিযাগ:
উত্তরের বগুড়া জেলা শহরের বাসিন্দা মাসুদ রানা স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। গত বছর সেটি বন্ধ ছিল । তার দুই মাসের বেতনও আটকে যায়। তিনি চরম সংকটে পড়েন। তিনি খাদ্য সহায়তা দেয়া এবং তালিকা তৈরির কথা শুনলেও এর কোনটিই পাননি। তিনি বলেন, আমার পরিবারে মা, দাদি, আমি এবং আমার ছোট ভাই-এই চারজনের পরিবারের পুরো দায়িত্বই আমার ঘাড়ে। আমরা যে পরিস্থিতির মধ্যে আছি, খাবার এবং অর্থসংকটে আছি। ধার করে চলছি। সরকারের খাদ্য সাহায্য বা তালিকা কিছুই আমরা পাইনি।
উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের উলিপুরেও এমন অভিযোগ ওঠে। কর্মহীন হয়ে পড়া ১৭ হাজার ১০৬ হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর নগদ অর্থ সহায়তার জন্য তালিকাভুক্ত করেন স্থানীয় জন-প্রতিনিধিরা। সেখানে হতদরিদ্র পরিবারের ৮ হাজার ৭৫৭ জন কোন টাকাই পায়নি। এসব মানুষ জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম-তারিখ, সিম রেজিস্ট্রেশনসহ বিভিন্ন তথ্যের গরমিল থাকায় এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। তালিকাভুক্ত উপকারভোগীদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের খাম-খেয়ালীপনার কারণে এ সমস্যায় পড়ে তারা সুবিধা বঞ্চিত হয়েছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আব্দুল কাদের বলেছিলেন, তালিকাভুক্ত যেসব উপকারভোগীর তথ্যে ভুল আছে তা সংশোধনের কাজ চলমান রয়েছে।বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রওনক জাহান বলেছিলেন, আমার উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার বরাদ্দ ছিল। এত লোকের তালিকা একদিন করা খুব কষ্টসাধ্য ছিল। তালিকাটি যখন আমরা জমা দিয়েছি, দেখা গেছে অসংখ্য মানুষের ফোন নম্বর নাই।
সার্বিক বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেছিলেন, চাল-গমের ক্ষেত্রে তো তছরুপ হওয়ার অনেক উদাহরণ রয়েছে। এবার শোনা গেল পাঁচ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা ব্যক্তিরাও আড়াই হাজার টাকা করে সহায়তা নেওয়ার তালিকায়। সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও শুধু উপকারভোগীদের ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনপদ্ধতির কারণে দুই মাসেও ৫০ লাখ লোককে টাকা দেওয়া গেল না। এটা দুঃখজনক।
#এনএম

Sharing is caring!