সামনে করোনা মোকাবেলায় বড় চ্যালেঞ্জ আসছে

নাগরিক প্রতিবেদক
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে শুরু করেছে। আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কোনভাবে তা কমছে না। সামনে আগস্ট মাসে আবারও তা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই বাড়ার ফলে যে চ্যালেঞ্জ আসবে তা মোকাবেলা করা ভোটারবিহীন সরকারের পক্ষে কঠিন হবে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, সরকারের করোনা মোকাবেলায় কোন ধরনের প্রস্তুতি ও চিন্তা নেই। তারা শুধু বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যস্ত। ফলে
দিনদিন বিষয়টি ঘন আকার ধারণ করছে। কিন্তু সরকারের মহল তা অনুধাবন করতে পারছে না।

করোনার ঊর্ধ্বমুখী অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদফতর। অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক বলেছেন, দেশে করোনা সংক্রমণ ফের বাড়তে শুরু করেছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে দেশের হাসপাতালগুলোতে শয্যার সঙ্কট দেখা দেবে। সংক্রমণ বাড়লে হাসপাতালে জায়গাও হবে না। বর্তমানে শহরের হাসপাতালে আসা ৭৫ শতাংশ রোগী গ্রামের। ঈদে যাওয়া-আসার কারণে সংক্রমণ ৫ থেকে ৬ গুণ বেড়ে গেছে বলেও জানান মন্ত্রী।

করোনায় গত ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ডসংখ্যক ২৪৭ জন মারা গেছে, যা এক দিনে মৃতের সর্বোচ্চ সংখ্যা। ঈদের আগে লকডাউনের বিরতি দেওয়ায় ঝুঁকির কথা বলেছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা, তা ভয়ঙ্করভাবে সত্যি হলো। পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দিয়ে এক দিনেই সর্বোচ্চ মৃত্যু ও সর্বোচ্চ রোগী শনাক্ত হয়েছে। সোমবার ১৫ হাজার ১৯২ জনের দেহে করোনার সংক্রমণ ধরা পড়েছে। করোনাকালের ষোলো মাসের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর একটি দিন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে এখন মৃত্যুর হার বেশি। ভারতে করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সেখানে মোট শনাক্তের সংখ্যা বিবেচনায় দেশে করোনায় মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

করোনার ভয়াবহতার মধ্যেই কোরবানির ঈদ উপলক্ষে বিধিনিষেধ শিথিল করেছিল সরকার। বিধিনিষেধ শিথিলে কোরবানির পশুর হাট, শপিংমল, মার্কেটে স্বাস্থ্যবিধি মোটেও মানা হয়নি। ঈদ শেষে কঠোরতম লকডাউনে ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় ফিরছে মানুষ। শিমুলিয়া-বাংলাবাজারের নৌরুটে স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে এখনও পদ্মা পার হচ্ছে মানুষ। এর মাসুল গুনতে হবে এমন আশঙ্কার কথা বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য বলছে, করোনা চিকিৎসায় সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ হাসপাতালে শয্যা খালি নেই। আইসিইউর জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, রাজধানীর ১৬টি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ৮টিতে কোনো আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, বর্তমান সংক্রমণে ভারতীয় (ডেল্টা) ভ্যারিয়েন্টই বেশি। এই ভ্যারিয়েন্টের সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র ছোঁয়াচে এই ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপে মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন বলেন, আগামী মাস অর্থাৎ আগস্টে বড় একটা ধাক্কা আসবে।

করোনাভাইরাসের ঊর্ধ্বগতি সামাল দেওয়া যাবে কি না, সে সংশয় জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম ইতোমধ্যেই জানিয়েছেন, আগের বিধিনিষেধ খুব একটা কাজে আসেনি। সীমান্তবর্তী জেলায় সংক্রমণ কিছুটা কমেছে। কিন্তু দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণের হার বেড়েছে। আরও কিছুদিন পর চলমান বিধিনিষেধের প্রভাব বোঝা যাবে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় শনাক্তের হার ছিল ২৯ দশমিক শূন্য ৮২ শতাংশ। গত কয়েকদিন ধরে শনাক্ত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে ওঠানামা করছে। দেশে এখন পর্যন্ত শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে ধরা যায়। সেখানে দেশে সংক্রমণের হার অতি উচ্চমাত্রায় অবস্থান করছে।

২৪ ঘণ্টায় ২৪৭ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু চট্টগ্রাম বিভাগে ৬১ জনের। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে ৪৬ জন, রাজশাহী বিভাগে ২১ জন, রংপুর বিভাগে ১৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৫ জন, সিলেট বিভাগে ১৪ জন এবং বরিশাল বিভাগে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত ১৯ হাজার ৫২১ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৯ হাজার ১১৯ জন ঢাকা বিভাগের। অর্থাৎ করোনায় বাংলাদেশে ৪৬ দশমিক ৭১ শতাংশ মানুষ মারা গেছে ঢাকার।

নতুন করে ১৫ হাজার ১৯২ জনের দেহে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। নতুন শনাক্ত রোগীদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ রোগী ঢাকা বিভাগের (৭ হাজার ৯৫৩ জন)। রাজশাহীতে ৯০৮ জন, চট্টগ্রামে ২ হাজার ৪৬৭, খুলনায় ১ হাজার ১৮৬, রংপুরে ৬৭৮, ময়মনসিংহে ৫৯৫, বরিশালে ৮৪১ ও সিলেটে ৫৬৪ জন শনাক্ত হয়েছে ২৪ ঘণ্টায়। নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৭৯ হাজার ৮২৭ জনে। আর এই শনাক্ত রোগীর অর্ধেকের বেশি ঢাকা বিভাগের ৭ লাখ ২০ হাজার ৯২১ জন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতি, স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন, মানুষের বেপরোয়া আচরণ ঢাকায় অতি উচ্চমাত্রার সংক্রমণ ও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম খান বলেন, সরকারের বিধিনিষেধ অমান্য করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যার দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, আমরা একটি খারাপ সময় পার করছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা এসব ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সংক্রমণ ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হবে না।

Sharing is caring!