অবাধে ঘুরছেন করোনা আক্রান্তরা

বাংলাদেশে অনেকেই এখন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরও ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন না বা নিজেরাও বুঝতে পারছেন না যে তারা আক্রান্ত৷ আর এই অবস্থা চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা৷

রোববার করোনায় সর্বোচ্চ মৃত্যু নিয়ে আলোচনায় আসে খুলনা৷ ঢাকাকে টপকে ২৪ ঘন্টায় ৩২ জন মারা যান সেখানে৷ ওই দিন ঢাকায় মারা যান ২১ জন৷ তবে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় মৃত্যু কমেছে৷ ১২ জন মারা গেছেন৷ কিন্তু খুলনার দুটি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞাতার কথা৷

দুইটি উপজেলার একটি দাকোপ৷ সেখানে গত এক সপ্তাহ ধরে মাস্ক পরাতে হাটে-বাজারে অভিযান পরিচালনা করছে ভ্রাম্যমাণ আদালত৷ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিন্টু বিশ্বাস জানান, এই অভিযান পরিচালানার সময় তারা প্রতিদিনই একটি অংশের অ্যান্টিজেন টেস্ট করান৷ আর সেই টেস্টে অনেক করোনা পজেটিভ পাচ্ছেন৷ তাদের হাসপাতালেও পাঠানো হচ্ছে৷

তিনি বলেন, ‘‘অনেকে উপসর্গ থাকার পরও বাইরে বের হচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ কিন্তু টেস্ট করাচ্ছেন না৷ হাসপতালেও যাছেন না৷ আবার কেউ কেউ আছেন তাদের উপসর্গ প্রকাশ পায়নি ৷ কিন্তু টেস্টে পজেটিভ আসছে৷’’

তিনি বলেন, অভিযান চালিয়ে, জরিমানা করেও তেমন মাস্ক পরানো যাচ্ছে না৷ অনেকের মধ্যেই উদাসীনতা রয়েছে৷ তারা করোনাকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না৷

খুলনার আরেকটি উপজেলা পাইকগাছা৷ সেখানেও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম খালিদ হোসেন৷ তিনি বলেন, ‘‘গত সাত দিন অভিযান চালানোর সময় আমরা ১২০ জনের অ্যান্টিজেন টেস্ট করিয়েছি৷ তাদের মধ্যে সাত জনের করোনা পজেটিভ পেয়েছি৷ যাদের কোনো উপসর্গ ছিল না৷’’

‘‘অনেকেই মাস্ক পড়তে চান না৷ এখন তারা অজুহাত দিচ্ছেন গরম লাগে বলে৷ তারা মনে করেন করোনায় তাদের কিছু হবে না,’’ বললেন এই কর্মকর্তা৷

আর খুলনার সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন জানান, শহরের দুইটি সরকারি কোভিড হাসপাতাল করোনা ছড়ানোর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে৷ সেখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই৷ সবাই হাসপাতালে খোলা হাটের মত আসা যাওয়া করছেন৷ মাস্ক পরা বা স্বাস্থ্যবিধির বালাই নাই৷ হাসপাতালের সামনের আড্ডায় অভিযান চালিয়ে অ্যান্টিজেন টেস্টে অনেক করোনা আক্রান্ত পাওয়া গেছে৷

এখন পরিস্থতি সামাল দিতে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন দেয়া হচ্ছে৷ সীমান্ত এলাকাসহ খুলনা, যশোরের বেশ কিছু এলাকায় লকডাউন চলছে৷ আর মঙ্গলবার থেকে ঢাকার আশপাশের সাতটি জেলায় লকডাউন শুরু হবে৷

জেলাগুলো হলো: নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ি ও মাদারীপুর৷ মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, প্রয়োজন মনে করলে যোকোনো জেলা স্থানীয়ভাবে লকডাউন দিতে পারবে৷

নারায়ণগঞ্জ গত বছর করোনার শুরুতেই হটস্পটে পরিণত হয়েছিলো৷ পরে সেটা লকডাউনসহ নানা প্রক্রিয়ায় কমিয়ে আনা যায়৷ কিন্তু এখন আবার করোনা আক্রান্ত বাড়তে শুরু করেছে বলে জানান সেখানকার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ৷ তিনি বলেন, ‘‘স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই আবার করোনা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে৷ আর নতুন করে লকডাউনে যেতে হচ্ছে৷’’ তিনি জানান, তারা পিসিআরের সাথে সাথে অ্যান্টিজেন টেস্ট করছেন৷ কিন্তু উপসর্গ না থাকলে টেস্ট করেন না৷ দৈব চয়নের ভিত্তিতে টেস্ট করলে হয়ত প্রকৃত অবস্থা বোঝা যেত৷

করোনার ভারতীয় ভেরিয়েন্ট (ডেল্টা) সীমান্ত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর এখন সারা দেশেই ছড়িয়ে পড়ছে৷ ঢাকায় আক্রান্তদের ৬৮ ভাগের মধ্যেই এই ভেরিয়েন্ট পাওয়া গেছে৷ দেশে এখন গড়ে প্রতিদিন অ্যান্টিজেন টেস্টসহ ২২ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা হচেছ৷ গত ২৪ ঘন্টায় আক্রান্তের হার ১৯.২৭ ভাগ৷ আর এপর্যন্ত গড় আক্রান্তের হার ১৩.৪৮ শতাংশ৷ গত ২৪ ঘন্টায় মারা গেছেন ৭৮ জন৷ এই ২৪ ঘন্টায় আগের দিনের তুলনায় এক হাজারেরও বেশি আক্রান্ত হয়েছেন৷ গত ২৪ ঘন্টায় চার হাজার ৫৬৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন৷ তবে পরীক্ষা বাড়ালে আক্রান্তের হার আরো বাড়বে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা৷

বিএসএমইউর সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম মনে করেন, ‘‘এভাবে আক্রান্তরা ঘুরে বেড়ালে এটা জ্যামিতিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে৷ তখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে৷ এখন গ্রামে যেভাবে ছাড়াচ্ছে তা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তাদের চিকিৎসা কোথায় হবে৷

সূত্র: ডয়েচে ভেলে

Sharing is caring!