পুলিশের হয়রানিতে চিকিৎসকরা

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:

বাংলাদেশে আজ থেকে শুরু হয়েছে সাতদিনের লকডাউন। কিন্তু এই লকডাউনেও বিশেষ প্রয়োজনে কিছু ব্যক্তি বের হতে পারবেন বলে নিয়ম করেছে ভোটবিহীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশাসন। তারা এজন্য একটি নিয়মও চালু করেছে। আর সেটির নাম দেয়া হয়েছে ‌‌‍‍‍’মুভমেন্ট পাস’। তবে এই মুভমেন্ট যাদের ছিল, বিশেষ প্রয়োজনে তাদের বের হতে গিয়ে পুলিশের হাতে সারাদিন অপদস্ত, হয়রানি ও গালাগালের শিকার হতে হয়েছে। তেমনি একটি পেশার মানুষ হলেন, চিকিৎসকরা। তারা নিজেদের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশের তাদের হয়রানি শুধু নয় সেই পুলিশের নোংরা ব্যবহারকে জায়েজ করতে জরিমানাও করেছে।

আর এ নিয়ে ফেসবুক থেকে শুরু করে বাংলাদেশের দালাল পত্রিকাগুলোসহ মেরুদণ্ড সোজা করা পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর টনক নড়েছে পুলিশ বাহিনীর। বাধ্য হয়ে তারা এক চিকিৎসকের জরিমানা ফেরত দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, বাকীদের কি হবে ? আর যারা এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে কি কোন ধরনের ব্যবস্থা নেবে দুর্নীতিবাজ প্রশাসন।

চিকিৎসকরা এমন হয়রানির আগে কিন্তু পুলিশের আইজিপি বেনজীর আহমেদ বলেছিলেন, আরোপিত সাত দিনের বিধিনিষেধের এই সময়ে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে চিকিৎসকদের বাইরে বের হতে বাধা নেই এবং মুভমেন্ট (চলাচল) পাস লাগবে না। কিন্তু কঠোর বিধিনিষেধের প্রথম দিনেই বাইরে বের হয়ে চিকিৎসকরা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন চিকিৎসক। হয়রানি ও অপদস্তের পর অনেকে চিকিৎসকই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্টাটাস দিয়ে এসব কথা তুলে ধরেছেন। কারও সিএনজি আটকে তার পাস কার্ড দেখতে চাওয়া হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিজের পরিচয়পত্র দেখালেও কাজ হয়নি। উল্টো তাকে গালাগাল , তার পা ভেঙ্গে দেয়ারও হুমকি দিয়েছে ওই পুলিশ। আইজিপি এমন ঘোষণা দিলেও কেন তার নির্দেশনা তৃণমূল পুলিশ সদস্যরা মানছেন না ?

ফেসবুকে চিকিৎসকদের ক্ষোভ:
কৃষ্ণা হালদার নামের এক চিকিৎসক লিখেছেন, ‍‘গত রাতে কুয়েত মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে আমার নাইট শিফটে ডিউটি ছিল। সকালে আমার ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার পিক-আপ করার সময় কারওয়ান বাজার সিগন্যালে ড্রাইভার আমার আইডি কার্ড দেখানোর পরও পুলিশ মামলা করেছে।’ অভিযোগ করে তিনি আরও লেখেন, ‘পুলিশ তাকে ফাইন (জরিমানা) করেছে, সব কাগজপত্র নিয়ে গেছে। পরে তিনি পুলিশের সহযোগিতা চেয়েও পাননি। বারবার চেষ্টা করেও তিনি মুভমেন্ট পাস বের করতে পারেননি বলেও উল্লেখ করেছেন।’

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে কাজ করা নার্সরা বিপাকে পড়েন একদম সকালে। হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক শাহজাদ হোসেন মাসুম লিখেছেন, ‘‍আমার আইসিইউর নার্সদের বহনকারী অধিদফতর থেকে স্টিকারযুক্ত গাড়ি টঙ্গী থেকে আসার সময় আটকে রাখে পুলিশ এবং জানায় মুভমেন্ট পাস ছাড়া যেতে দেবে না। তারা আমাকে কল করলে আমি পরিচালককে জানাই। তারা কোভিড আইসিইউর স্টাফ উল্লেখ করে অনেকবার অনুরোধ করলেও পুলিশ মুভমেন্ট পাস ছাড়া গাড়ি ছাড়বে না বলে জানায়। দুই ঘণ্টা আটকে থাকার পর তারা হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবেদনবিদ্যা (অ্যানেস্থেসিয়া) বিভাগের চিকিৎসক ইফতেখারকে ফার্মগেটে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি রাতের ডিউটি সেরে বাসায় ফিরছিলেন। পরে ওই চিকিৎসক সাত কিলোমিটার হেঁটে রামপুরার বাসায় পৌঁছান।

স্কয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক নাজমুল ইসলামের স্ত্রী চিকিৎসক ইসরাত জাহান ফেসবুকে স্ট্যাটাসও দিয়েছেন। সঙ্গে তার স্বামীকে যে তিন হাজার টাকার জরিমানা গুণতে হয়েছে সেই স্লিপও যুক্ত করেছেন।

ইসরাত জাহান লিখেছেন, ‘‌আমার হাসবেন্ড স্কয়ার হসপিটালের কোভিড ইউনিটে কর্তব্যরত আছেন। আজকে সকাল ৮টা থেকে তার ডিউটি ছিল। আমাদের বাসায় আমার শ্বশুর কোভিড পজিটিভ হওয়ায় আমার হাসবেন্ড বাসা (মুন্সিগঞ্জ) থেকে নিজেদের গাড়ি নিয়ে ডিউটিতে যাচ্ছেন বেশ কিছুদিন ধরে। সকালে আমাদের গাড়ি সাইনবোর্ডের একটু পরে থামায় পুলিশ এবং তিন হাজার টাকা জরিমানা করে। আমার হাসবেন্ডের সঙ্গে তার কর্মস্থলের আইডি কার্ড ছিল। স্কয়ার হাসপাতালের ট্রান্সপোর্ট অবশ্যই মুন্সিগঞ্জ আসবে না। আর হঠাৎ একটা অ্যাপ বানিয়ে বলল নেন মুভমেন্ট পাস নামক সার্কাস নিয়া বাইর বের হবেন, যেখানে তাদের ওয়েবসাইটেই ঢোকাই যায় না। এমতাবস্থায় ডাক্তাররা কি সারাদিন ডিউটি বাদ দিয়ে পাস পাস খেলবে নাকি?’

রিয়াজ আহমেদ তমাল লিখেছেন, ‘৭টায় গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট থেকে রিকশাযোগে আসার সময় টঙ্গী স্টেশন রোডে পুলিশ আটকায়। আমার আইসিডিডিআর,বি আইডি কার্ড দেখালে বলে যে আমাদেরও নাকি বের হওয়া নিষেধ। অবশেষে বলে দিলেন যে, হাসপাতালে ডিউটি করতে হলে রাতে সেখানে থেকে যেতে।’

এদিকে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটিজ (এফডিআরএস) জানিয়েছে, বিধিনিষেধের প্রথম দিনে কর্মস্থলে যাওয়া-আসার পথে ভোগান্তিতে পড়েছেন চিকিৎসকরা। অনেককেই গুণতে হয়েছে জরিমানা। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে দেওয়া, কিংবা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত পথে আটকে থাকার মতো ঘটনাও ঘটেছে। তবে এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ভোটবিহীন দুর্নীতিবাজ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বেকায়দায় পড়ে বলেছেন, ‘চিকিৎসকরা যেহেতু জরুরি পরিসেবায় নিয়োজিতদের মধ্যে পড়েন, সেহেতু পরিচয় দেওয়ার পরও তার নামে মামলা দেওয়া উচিত হয়নি। যা হয়েছে ঠিক হয়নি, মহা-অন্যায় হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে জরুরি বিভাগ তো খোলা, সে হিসেবে চিকিৎসকরা তো অবাধে কর্মস্থলে যেতে পারার কথা। তা না হলে তারা এতো রোগীর চিকিৎসা কীভাবে দেবেন? তারা যে কষ্ট করে যাচ্ছেন, এটাই তো বেশি। আর যেন এমন না হয়, তা নিশ্চিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।’

তবে এসব ঘটনার পর এফডিআরএসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিকিৎসকদের কর্মস্থলে যাওয়ার পথে বিভিন্ন স্থানে পুলিশি হয়রানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিকভাবে এফডিএসআরের পক্ষ থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন মহলে বিভিন্ন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। পুলিশের আইজিপি এ বিষয়ে অবহিত হয়েছেন।

বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে আজ বিভিন্ন স্থানে যেসব হয়রানির শিকার হয়েছেন সব চিকিৎসকের প্রতি আমাদের সহমর্মিতা। আমরা এ অভিযোগ পাওয়ার পর থেকে গণমাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আমাদের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছি, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জোর দাবি জানিয়েছি। তারা আগামীতে যেন কোনো চিকিৎসককে এমন হয়রানি না করেন সে বিষয়ে সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।

এর আগে মঙ্গলবার (১৩ এপ্রিল) পুলিশের আইজিপি বেনজীর আহমেদ জানিয়েছিলেন, লকডাউন চলাকালে চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ সরকারি জরুরি সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কোনো মুভমেন্ট পাস নিতে হবে না।

Sharing is caring!