হেফাজতকে চাপে রাখতে আ.লীগের নানা কৌশল

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:

বাংলাদেশের ভোটবিহীন আওয়ামী লীগ সরকার আগে হেফাজতকে কোন প্রতিপক্ষ মনেই করত না। এ কারণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তারা তাদের দাওয়াত করে খাওয়াতেন। এমনকি হেফাজতে ইসলামের আমির মরহুম আল্লামা শফি অসুস্থ হলে তাকে হেলিকপ্টার দিয়ে ঢাকায়ও আনা হয়েছিল। এসব বিষয় সকলের জানা। কিন্তু নতুন খবর হলো, এই হেফাজতকে এখন নানা চাপে রেখেছে সরকার। তাদের বেকায়দায় ফেলতে নানা ছকও এঁকেছে। আর এসব ছক ও কৌশল কি হবে তা সরাসরি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা করছেন। তা পরে বাস্তবায়ন হচ্ছে বাংলাদেশের ভোটবিহীন সরকারের দলীয় প্রশাসনের লোকজনকে দিয়ে।


মাওলানা মামুনুলের রিসোর্ট ক্যালেঙ্কারী, বায়তুল মোকাররমে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মী বাহিনী দিয়ে সাধারণ মুসল্লীদের উপর বর্বরচিত হামলা ও বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর সবই ছিল এই ছকের অংশ। এখন শুধু বাকী মিডিয়া ট্রয়াল। এই ট্রয়াল হলেই হেফাজতকে নিষিদ্ধও করবে সরকার। ইতোমধ্যে আমেরিকা ভিত্তিক বাংলাদেশের ভোটবিহীন সরকারের কিছু অনুগত লোক ও তাদের তৈরি সংগঠন হেফাজতকে নিষিদ্ধের জন্য আমেরিকার এক মন্ত্রীর কাছে দাবিও জানিয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সরকারের কাছে দাবি না করে আমেরিকার কাছে এমন দাবি কেন? অনেকে মনে করছেন, এই দাবি আদায়ের বুদ্ধিরা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার। তারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদশকে মৌলবাদী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে চায়। এ জন্য নানা ছকও আঁকছে। উগ্রবাদী হিন্দু নেতা ও ভারতের প্রধানন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আসার সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করেছিল হাসিনা সরকার। এরপর স্বাভাবিক হলে মানুষের ক্ষোভ কমছে না।
বাংলাদেশের
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, হেফাজতের আন্দোলনে জড়িত নন, এমন ব্যক্তিদেরও জ্বালাও পোড়ায়ের মামলা দেয়া হয়েছে। তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে নিচ্ছে ভোটবিহীন হাসিনার সরকার।

সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের জেরে বহুমুখী চাপে রয়েছে হেফজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির যেকোনো ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে প্রশাসন। সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা কৌশল অবলম্বন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব কৌশলের মধ্যে পুরনো মামলা সচলসহ নতুন মামলা ও জিডি দায়ের, প্রথম সারির নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, নাশকতা প্রতিরোধে থানায় থানায় নিরাপত্তা জোরদার, যেকোনো জমায়েত নিষিদ্ধকরণ, হেফাজতের কর্মকাণ্ড নিয়ে ইসলামী সমমনা সংগঠনের নেতিবাচক মনোভাব ও প্রচারণা, কওমি মাদ্রাসাসহ ওই ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখাসহ অনেক কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক কথায় প্রশাসনের নানা পদক্ষেপ ও হেফাজতের মতো অরাজনৈতিক সংগঠনের সহিংসতায় জনসাধারণের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ায় দৌড়ের ওপর রয়েছে সংগঠনটি।

পুলিশ ও হেফাজত সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সহিংসতার ঘটনায় মঙ্গলবার পর্যন্ত সংগঠনের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর বাইরে পুরনো মামলায়ও গ্রেফতার করা হয়েছে। ২০১৩ সালে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলাচত্বরে জ্বালাও-পোড়াও মামলায় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে গ্রেফতারের পর সোমবার সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর ঘটনায় সোমবার সংগঠনের বর্তমান আমির জুনাইদ বাবুনগরীসহ ৪৩ জনের বিরুদ্ধে পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। যদিও মঙ্গলবার রিপোর্টকে মিথ্যা ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে দাবি করেছে সংগঠনটি। নারায়ণগঞ্জে মামুনুলের রিসোর্ট কাণ্ডে সেখানে ভাঙচুরের মামলায় মাওলানা ইকবালসহ ছয়জনকে গ্রেফতারের পর চারজনকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্যের জেরে ময়মনসিংহে ওয়াসিক বিল্লাহ নোমানীকে এবং কথিত ‘শিশুবক্তা’ রফিকুল ইসলাম মাদানীকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেফতার করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নতুন করে আরও ৬০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, নতুন ও পুরনো মিলিয়ে প্রায় ১৬৫টি মামলায় হেফাজতের লাখের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করে রাজধানীর কয়েকটি স্থানসহ দেশের চারটি জেলায় অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অস্ত্র লুটসহ নাশকতার অভিযোগে প্রায় ৮২টি মামলায় সংগঠনের ৫০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ বাদী হয়ে এসব মামলা করেছে। হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের এসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। এর বাইরে নাশকতায় ইন্ধনদাতা ও মদদদাতা হিসেবে জামায়াত-শিবির ও বিএনপির অনেক নেতকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলাচত্বরে নাশকতার ঘটনায় করা ৮৩টি পুরনো মামলা নতুন করে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় ৩ হাজার ৪১৬ জনের নামসহ ৮৪ হাজার ৯৭৬ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে তিনটি মামলা ছাড়া বাকিগুলোর তদন্ত কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে স্থবির অবস্থায় ছিল। স্থবির অবস্থায় বেশিরভাগ মামলা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তদন্তাধীন।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেছেন, মানুষের জীবন ও সম্পত্তি সুরক্ষায় পুলিশ প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত রয়েছে। কাউকে ছাড়া দেওয়া হবে। সম্প্রতি তাণ্ডবের ঘটনাসহ আগের নাশকতায় জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।

Sharing is caring!