ডিপ ফ্রিজে থাকা হেফাজতের ৬০ মামলা সক্রিয় হচ্ছে

এতদিন ধরে ডিপ ফ্রিজেই ছিল হেফাজতের ইসলামীর ৬০ মামলা। কিন্তু সেগুলো আবারও সক্রিয় করা হচ্ছে। গত আট বছর আগে মতিঝিলের ঘটনায় সেগুলো দায়ের করেছিল পুলিশ। আবারও সেগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে। শুধু কি তাই, এসব মামলার দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করে চার্জশিটও দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একটি সুত্র।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে আসাকে কেন্দ্র করে হেফাজতের কর্মীরাযে ভাঙচুর, জ্বালাও পোড়াও ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছে তা ভাবিয়ে তুলেছে সরকারকে। এ কারণেও হয়ত মামলাগুলো আবারও সক্রিয় করা হচ্ছে। তবে এতদিন হেফাজতের নেতাদের নমনীয় আচরণের কারণে সেগুলো ডিপ ফ্রিজে ছিল ও আলোর মুখও দেখেনি বলেও মনে করা হয়। তবে এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মোদীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তিন তিন ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও ব্যাপক তাণ্ডব চালায় হেফাজত। তাদের হিংস্রতা ও রোষানল থেকে এবারও বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সংগীতাঙ্গনও। মোদী বিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে তাণ্ডবের ঘটনায় ঢাকার বিভিন্ন থানায় ৫টিসহ আরও ২৭টি নতুন মামলা হয়েছে। মামলাগুলোতে মোট আসামির সংখ্যা ২৭ হাজার। এসব মামলার ভবিষ্যৎ নিয়েও অনেকে সন্দিহান। এসব প্রেক্ষাপটে হেফাজতের পুরোনো মামলার তদন্তে গতি পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আব্দুল্লাহ আবু বলেন, হেফাজতের যেসব মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি তা দ্রুত নিষ্পত্তি করে আদালতে পুলিশের প্রতিবেদন দাখিল করা জরুরি। কিছু মামলার চার্জশিট আগেই হয়েছে। সেগুলো বিচারের অপেক্ষায় আছে। আরও কিছু মামলায় হেফাজতের অনেক নেতাকর্মী জামিনে আছেন। জামিনে থেকে তারা যদি আবার সহিংসতায় জড়ান তাহলে জামিন বাতিলের জন্য আবেদন করা হবে।

তবে হেফাজতের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত কাজ শেষ না করে ঝুলে রাখাটা ঠিক হয়নি বলে মনে করেন
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক। তিনি বলেন, এত বছর ধরে এসব মামলা মুলতবি রাখা যথার্থ হয়নি। এখানে সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ছিল। দীর্ঘকাল মামলা ঝুলে থেকে ওদেরও সাহস বেড়ে গেছে। বারবার সহিংস তাণ্ডব চালালেও তাদের কিছু হবে না- এরকম একটা ধারণা তাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে আছে। ফলে দ্রুত সুষ্ঠু তদন্ত করে মামলার চার্জশিট দাখিল করতে হবে। যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে না, তারা রেহাই পাবে।

২০১৩ সালে রাজধানীর শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় হেফাজতের পক্ষ থেকে ১৩ দফা দাবি দেয়া হয়। তার মধ্যে নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি দিতে হবে। এরপর ওই বছরের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন হেফাজতের বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক। এক পর্যায়ে হেফাজতের উগ্র নেতাকর্মীরা সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুর ও নাশকতা চালায়। এসব ঘটনায় ঢাকাসহ ৭টি জেলায় মোট ৮৩টি মামলা দায়ের করা হয়। মামলাগুলোতে তিন হাজার ৪১৬ জনের নামে এবং ৮৪ হাজার ৭৯৬ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়। আসামিদের মধ্যে হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট, জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রদল, যুবদল, নেজামে ইসলাম, খেলাফত মজলিশ, খেলাফত আন্দোলন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাকর্মীদের নাম আছে। হেফাজতের যে ২৩ মামলার চার্জশিট দেওয়া হয় সেগুলোর বিচার কার্যক্রমও ধীরগতিতে চলছে। পুরোনো মামলার মধ্যে বাগেরহাটের একটির রায়ে সব আসামি খালাস পেয়েছেন।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘২০১৩ সালের সহিংসতার ঘটনায় হেফাজতের তৎকালীন মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মুফতি ওয়াক্কাস, বিএনপি-জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাসহ অন্তত ৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তারা জামিনে মুক্তি পান। হেফাজতের তৎকালীন আমির আহমদ শফীর মৃত্যুর পর বর্তমানে সংগঠনটি চলছে নতুন নেতৃত্বে। নতুন নেতৃত্বে আরও মৌলবাদী উগ্রপন্থি ভূমিকায় তাদের দেখা যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হেফাজত কতটা ভয়ংকর ও হিংস্র তার উদাহরণ দিয়েছেন সেখানে দায়িত্ব পালনকারী এক সাবেক কর্মকর্তা। তিনি জানান, একবার সেখানকার ডিসির বাংলোতে হাজার হাজার জুতা নিক্ষেপ করেছিল হেফাজতের কর্মীরা। ওই জুতা সরাতে তিনটি ট্রাক লেগেছিল। এ ছাড়া একাধিকবার তারা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে হামলা চালায়। ১৯৯৯, ২০০৪, ২০১৬ সালে দুই দফা ও সর্বশেষ গত শুক্রবার থেকে টানা তিন দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৃশংস হামলা চালায় হেফাজত। দায়িত্বশীল গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ‘স্থানীয় একজন ডাক্তার হেফাজতকে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে ওই এলাকায় অর্থ, পরামর্শসহ নানাভাবে সহায়তা করে আসছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাস্তবতায় দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বাড়ানো প্রয়োজন। নতুন কৌশল প্রয়োগ করে হেফাজতকে দমন করা না হলে তারা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবে।


Sharing is caring!