ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের বিরুদ্ধে রিপোর্ট এর কারণে সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার অপহরণ, তিন দিন পর উদ্ধার

গোলাম সরোয়ার কেন নিখোঁজ হয়েছিলেন— এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে তার সহকর্মী সাংবাদিকদের দাবি, তার অনলাইন পোর্টালে দুটি ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। এগুলোর জের ধরে তাকে অপহরণ করা হতে পারে। এর মধ্যে গত ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল— ‘চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর জায়গায় ভূমিমন্ত্রীর ভাইয়ের কুদৃষ্টি।’ ওই রিপোর্টে বলা হয়, ‘চট্টগ্রামে ব্যবসায়ীর জায়গা অবৈধভাবে দখলের চেষ্টা করছে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের ভাই আনিসুজ্জামান। নগরীর সার্সন রোডের জেএস কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের চলমান একটি ফ্ল্যাট প্রকল্পের জায়গা নিজের বাউন্ডারি ওয়াল যুক্ত করে দখলের চেষ্টা করছে। প্রকল্পের জায়গায় কাজ করতে গেলে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে এই ব্যবসায়ীকে।’ ঘটনাচক্রে সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারের বাসাও এই এলাকাতেই। তিনি সেখান থেকে বের হওয়ার পর তার আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

গত ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত তার অন্য একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল— ‘চট্টগ্রামে অভিজাতে ফের আলোচনা ক্যাসিনো’। এই রিপোর্টে শিল্পপতি ও রাজনৈতিক নেতার ছেলের বিরুদ্ধে নগরীর খুলশীকেন্দ্রিক একটি ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলা হয়। ঘটনাচক্রে এই রিপোর্ট প্রকাশের পরদিনই তিনি নিখোঁজ হন।

এদিকে “সাংবাদিকদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য সরোয়ারকে তুলে এনেছি, হত্যার জন্য নয়। ও সাংবাদিক, খবরদার ওকে হত্যা করা যাবে না’— অপহরণের পর মোবাইল কথোপকথনে এমন কথা বলতে শুনেছেন উদ্ধার হওয়া সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার।

রোববার (১ নভেম্বর) রাত আটটার দিকে স্থানীয়রা সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী একটি খাল পাশের ঝোপঝাড় থেকে গোলাম সরোয়ারকে উদ্ধার করে। এ সময় গোলাম সরোয়ারের গায়ে একটি গেঞ্জি ও আন্ডারওয়ার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। উদ্ধার হওয়ার পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শয্যাশায়ী চট্টগ্রামের এই সাংবাদিক তার সহকর্মীদের জানিয়েছেন, ‘অপহরণকারীরা বারবার অজ্ঞাত লোকের সাথে কথা বলছিল। মোবাইলের অপর প্রান্তের লোককে স্যার স্যার করে কথা বলছিল।’

গত ২৯ অক্টোবর সকালে চট্টগ্রাম নগরীর ব্যাটারি গলির বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রামের সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারের আর খোঁজ মিলছিল না। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারের পরিবার ও তার সহকর্মীরা। গোলাম সরোয়ার সাপ্তাহিক আজকের সূর্যোদয়ের স্টাফ রিপোর্টার এবং সিটিনিউজ নামের একটি অনলাইন পোর্টালের নির্বাহী সম্পাদক।

অপহরণের শিকার সাংবাদিক গোলাম সরোয়ার জানান, তাকে তুলে নেওয়ার পর লোহার রড, লাঠি ও গাছ দিয়ে সারা শরীরে মারধর করা হয়েছে। অপহরণকারীরা মারতে মারতে তাকে জিজ্ঞেস করছিলেন— ‘আর নিউজ করবি?’

উদ্ধার হওয়ার পর হাসপাতালে শয্যাশায়ী সাংবাদিক গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘আমাকে চার জনে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। আমার বাইকের পেছনে বসে এক লোক আমাকে কালো হেলমেট পরিয়ে দেয়। এটি পরিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। আমাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলেছে— এমনটি বুঝতে পারি। আমাকে যেখানে রেখেছিল, সেখানে ট্রেন চলাচলের শব্দ শুনতাম।’

সরোয়ার বলেন, ‘আমি পাঠাও বাইকে করে বুধবার রাতের ১১টায় নগরীর কাজির দেউড়ি আলমাস সিনেমার পাশে বাসায় যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছিলাম। ভিআইপি টাওয়ারের সামনে থেকে হঠাৎ জোর করে পাঠাও বাইকের পেছনে অপর একজন উঠে পড়ে। এরপর আর কিছুই মনে ছিল না আমার।’

রোববার রাত আটটার সীতাকুন্ডের কুমিরা থেকে সাংবাদিক গোলাম সরোয়ারকে উদ্ধার করার পর তাকে রাত সাড়ে নয়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১৪ নং ওয়ার্ডের এইচডিইউ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। রাত ১০টার দিকে তিনি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আলতো আলতো কথা বলতে শুরু করেছেন। ওই ইউনিটের চিকিৎসক ডা. ওমর আলী বলেন, ‘সরোয়ারের শরীরের ইসিজি করা হয়েছে। তিনি এখন অনেকটা সুস্থ আছেন।’

Sharing is caring!