লুটপাটে রাজা যুবলীগ নেতা মহি

মহিউদ্দিন মহি। যুবলীগের এক পরিচিত নেতা। সকলে কমবেশি এই মহিউদ্দিন মহির কথা জানেন। দেশে ক্যাসিনো কাণ্ডে যে কয়েকজন যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নাম এসেছিল তাদের মধ্যে মহি অন্যতম। এই মহি অল্প দিনেই এখন কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। করেছেন পাঁচ তলা বাড়ি, গাড়ি ও ব্যাংক ব্যালেন্স। তবে সবই লুটের টাকায়। এই মহির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাত হাজার ৩৯৮ ভরি স্বর্ণ আত্মসাতের মামলা রয়েছে। সেই মামলার অন্যতম আসামি তিনি। শুধু তাই নয়, গ্রাহকের আমানতের ১৩ হাজার ২২৫ ভরি স্বর্ণ আত্মসাতেরও অভিযোগ আছে। এছাড়া ঘুষ নিয়ে বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্যও তো আছেই। তবে এসবের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এত কিছু করার পরও বহাল তবিয়তে আছেন সেই যুবলীগ নেতা মহি। তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি তিনি নিরাপরাধ।

সূত্র জানায়, ঢাকা থেকে মোট ৩৩৫ গ্রাহকের এক হাজার ৫৯৪ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে চেয়ারম্যান চক্র। গড়ে ১৮ ক্যারেট হিসেবে প্রতি ভরি ৫৪ হাজার ১৮০ টাকা ধরে মোট আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা। গ্রাহক নিখোঁজের সুযোগটি কাজে লাগায় ব্যাংকের একটি চক্র। গ্রাহকের পরিচয়পত্র নকল করে সমবায় ব্যাংকে আবেদন করার নাটক সাজায় চক্রটি। স্বর্ণ ফেরত পেতে এক হাজার ৯৮৪টি আবেদন করেন গ্রাহকরা। কিন্তু এর বেশিরভাগই ছিল ভুয়া। মোট পাঁচ হাজার ৮০৩ ভারি ১৩ আনা স্বর্ণ প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। জুয়েলারি সমিতির মূল্য তালিকা অনুযায়ী ওই সময় সেসব স্বর্ণের মূল্য ছিল ৩১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা

সমবায় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ঋণের বিপরীতে ১৩ হাজার ২২৫ ভরি স্বর্ণ জামানত রেখেছিল নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড। তবে দীর্ঘ ১০ বছরেও সে ঋণ পরিশোধ করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। বহুবার চিঠি দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে সমবায় ব্যাংকের ৩০তম ব্যবস্থাপনা কমিটির ৫১তম সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত আসে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে বন্ধকি ঋণের বিপরীতে মেয়াদোত্তীর্ণ স্বর্ণ বিক্রি করা হবে জানানো হয়। তা না হলে ব্যাংকের তারল্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা দেখা যায়।

জানা গেছে, ঢাকার মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় ক্যাসিনো কাণ্ডের পরপরই আলোচনা আসেন মহি। এরপর থেকে নানাভাবে গা ঢাকা দেন তিনি। তবে সর্বশেষ তার বিরুদ্ধে ২০২০ সালের ২৮ ডিসেম্বর স্বর্ণ জালিয়াতি, ঘুষ বাণিজ্য ও ক্যাসিনো ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তখন সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ মহি। তার এই অভিযোগ পড়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। এরপর ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি মহিসহ নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এই মামলায় পরে চেয়ারম্যান মহি জামিন নেন কিন্তু ব্যাংকের বাকী পাঁচ কর্মকর্তা ফেসে যান। ওই মামলায় গ্রেফতার হন- সমবায় ব্যাংকের উপ-মহাব্যবস্থাপক আব্দুল আলিম, সহকারী মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) হেদায়েত কবীর, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার ও সমবায় ভূমি উন্নয়ন ব্যাংকের এস এস রোড শাখার ব্যবস্থাপক মো. মাহাবুবুল হক, প্রিন্সিপাল অফিসার মো. ওমর ফারুক ও সিনিয়র অফিসার (ক্যাশ) নূর মোহাম্মদ। তারা এখনো হাজত খাটছেন। তবে সম্প্রতি দুজন জামিনে আছেন বলেও জানা গেছে।

দুদকের অনুসন্ধানে প্রতিবেদন বলছে, ব্যাংকটিতে স্বর্ণ লুটপাটের জন্য একটি চক্র গড়ে ওঠে। সেই চক্রের
নারায়ণগঞ্জ কো-অপারেটিভ ক্রেডিট লিমিটেড কর্তৃক স্বর্ণ ফেরত পেতে সমবায় ব্যাংক বরাবর মোট এক হাজার ৯৮৪টি আবেদন জমা হয়। এর মধ্যে মাত্র তিনটি আবেদনপত্র সঠিক ছিল। বাকি এক হাজার ৯৮১টি আবেদন ছিল ভুয়া। কারণ আবেদনপত্রের সঙ্গে মূল আবেদনপত্রের স্বাক্ষরের (১০ বছর আগে দেওয়া গ্রাহকের স্বাক্ষর) কোনো মিল নেই। এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের সঙ্গেও কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায়নি। এভাবে মোট পাঁচ হাজার ৮০৩ ভারি ১৩ আনা স্বর্ণ প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। জুয়েলারি সমিতির মূল্য তালিকা অনুযায়ী ওই সময় সেসব স্বর্ণের মূল্য ছিল ৩১ কোটি ৪৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, ঢাকাতেও স্বর্ণ জালিয়াতির প্রমাণ পেয়েছে দুদক। দুদকের ওই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ঢাকা অংশে ভুয়া স্বাক্ষর ও নকল পরিচয়পত্র দিয়ে মোট ৪৫৫টি আবেদন করেন গ্রাহকরা। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ১২০ জন সঠিক গ্রাহককে স্বর্ণ ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি ৩৩৫টি আবেদন ভুয়া হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। এভাবে ঢাকা থেকে মোট ৩৩৫ গ্রাহকের এক হাজার ৫৯৪ ভরি ১৪ আনা স্বর্ণ আত্মসাৎ করেছে চেয়ারম্যান চক্র। গড়ে ১৮ ক্যারেট হিসেবে প্রতি ভরি ৫৪ হাজার ১৮০ টাকা ধরে মোট আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা।

যুবলীগের এই নেতা ও সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন মহি দেশের একটি অনলাইন গণমাধ্যমকে বলেন, যেসব অনিয়ম হয়েছে তার সঙ্গে আমি জড়িত নই। কয়েকজন কর্মকর্তা এসব অনিয়ম করেছেন। বিষয়টি প্রথমে আমি জানতাম না। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আমার জানার কথা নয়। তবে চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। এটা আমার ক্যারিয়ারের বিষয়। কে বা কার একটি অভিযোগের ভিত্তিতে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অথচ অনিয়মের বিষয়টি সম্পর্কে আমি কিছুই জানতাম না। দুদক এখন তদন্ত করছে। আশা করছি, এ অনিয়মে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাবে না। কারণ আমি সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তবে তাকে ফাঁসানোর জন্য একটি চক্র এমন করতে পারে বলে তার ধারনা।


Sharing is caring!