এক হাজার কোটি টাকার কাজ ৪ হাজার কোটিতে

কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণে ‘উঁচু-নিচু’র যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে তা নিরসন হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নতুন নকশায় নির্মাণ করা হচ্ছে বহুল প্রত্যাশিত এই নতুন সেতু। আগামী জুনের মধ্যেই নতুন নকশা প্রণয়ন শেষ হবে। নকশা অনুযায়ী, মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে আগের মতোই, প্রায় এক কিলোমিটার। তবে সেতুর দুই পাশে দুই কিলোমিটার করে চার কিলোমিটার ভায়াডাক্টসহ পুরো সেতুটির দৈর্ঘ্য হবে পাঁচ কিলোমিটার। তবে নির্মাণ কাজ শুরুতে বিলম্ব এবং আগের চেয়ে বেশি উচ্চতায় সেতু করতে গিয়ে ব্যয় বাড়ছে চারগুণ! শুরুর দিকে এক হাজার কোটি টাকায় সেতু নির্মাণ হওয়ার কথা থাকলেও নতুন সেতু নির্মাণে ব্যয় হবে চার হাজার কোটি টাকার ওপরে।

ভায়াডাক্ট হলো সেতুর মতোই এক ধরনের সেতু। পিলার ও স্প্যানের মাধ্যমে ভায়াডাক্ট সেতু নির্মাণ করা হয়। সাধারণত সেতুর উচ্চতা বেশি হলে ট্রেনকে সেই উচ্চতায় চালাতে ভায়াডাক্টের মাধ্যমে অনেক দূর থেকে একটু একটু করে সমান্তরাল করার মাধ্যমে মূল সেতুর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পদ্মা সেতুতে ট্রেন চালাতেও এ ধরনের ভায়াডাক্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

কর্ণফুলী নদীর কালুরঘাটে পৃথক সড়ক ও রেলসেতু হবে, নাকি রেল কাম সড়ক সেতু হবে? সেই সেতু কি সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয় করবে নাকি রেলপথ মন্ত্রণালয় করবে- এ নিয়ে বিভিন্ন সময় জটিলতা দেখা দেয়। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শেষ পর্যন্ত রেলপথ মন্ত্রণালয়ই সেতুটি নির্মাণ করছে এবং সেতুটি হচ্ছে রেল কাম সড়ক সেতু। আগে বর্তমান সেতুর দক্ষিণে নতুন সেতু নির্মাণের কথা থাকলেও এখন সেটি উত্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সাত দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় সেতুটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল রেলওয়ে। সেভাবে নকশাও প্রণয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই নকশা অনুযায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে তাতে আপত্তি জানায় বিআইডব্লিউটিএ। এখন প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তে ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। নতুন করে নকশা প্রণয়ন করছে কোরিয়ান ইউশিন নামে এক প্রতিষ্ঠান।

কালুরঘাট সেতু প্রকল্পের পরিচালক ও রেলওয়ের পরিচালক (প্রকিউরমেন্ট) গোলাম মোস্তফা বলেন, নতুন নকশা অনুযায়ী ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় নির্মাণ করা হবে কালুরঘাট নতুন সেতু। এতে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। রেলের এই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান সেতুটির দৈর্ঘ্য ৭৬০ মিটার বা প্রায় এক কিলোমিটার। নতুন মূল সেতুর দৈর্ঘ্যও হবে পুরোনো সেতুর সমান। ভায়াডাক্টসহ পুরো সেতু হবে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। সব প্রক্রিয়া শেষ করে সেতুর মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু হতে এক বছর লেগে যেতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের মার্চে কাজ শুরু করে ২০২৩ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালে একনেকের এক বৈঠকে নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ার পর কার্যত সেই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। নতুন নকশায় সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে দাতা দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

নানা জটিলতায় কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণ প্রক্রিয়া হোঁচট খাচ্ছিল। সর্বশেষ নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের একটি গেজেট এই সেতু নির্মাণে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ওই গেজেটে দেশের সব নদীকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এতে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, গোমতী, কর্ণফুলীসহ কয়েকটি প্রধান নদীকে প্রথম শ্রেণিভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে কর্ণফুলী নদীর বঙ্গোপসাগর মোহনা থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত অংশকে প্রথম শ্রেণিভুক্ত এবং শাহ আমানত সেতু থেকে হালদা নদীর মোহনা পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে। প্রথম শ্রেণির নদীতে সেতু করতে হলে তার উচ্চতা হতে হবে ১৮ দশমিক ৩ মিটার, দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত নদীতে সেতু হলে উচ্চতা হতে হবে ১২ দশমিক ২ মিটার এবং তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত নদীতে সেতু হলে উচ্চতা হতে হবে ৭ দশমিক ২ মিটার। মূলত প্রাকৃতিক কোনো দুঃসময়ে জাহাজ পারাপারে কোনো সেতু যাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে, সেজন্য সেতু নির্মাণে উচ্চতা নির্ধারণ করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ। তাই কর্ণফুলীর কালুরঘাট পয়েন্টে সেতুটি ১২ দশমিক ২ মিটার উচ্চতায় করার বাধ্যবাধকতা দেখা দেয়।

চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন যাচ্ছে। আগামী বছরের মধ্যে রেললাইনের কাজ শেষ হলে শুরু হবে ট্রেন চলাচল। কিন্তু তার আগে কালুরঘাটে নতুন সেতু হচ্ছে না। নতুন সেতু না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান সেতু দিয়েই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারে ট্রেন চালাতে হবে।

৯১ বছর আগে নির্মাণ করা কালুরঘাট সেতুর এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। জোড়াতালি দিয়ে ট্রেন ও সাধারণ যানবাহন চলাচল সচল রাখা হয়েছে। আবার সেতুটি একমুখী হওয়ায় প্রতিনিয়ত যানজট লেগে থাকে। সেতু পার হতে দুর্ভোগের সীমা থাকে না। কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের।

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আবদুল মোমিন বলেন, সেতুটি শুধু আঞ্চলিক স্বার্থ নয়, জাতীয় স্বার্থেও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হোক।

১৯৩০ সালে নির্মাণ করা কালুরঘাট সেতুর পাশে নতুন সেতু নির্মাণে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন জাসদের কার্যকরী সভাপতি ও বোয়ালখালী আসনের সংসদ সদস্য মইনউদ্দীন খান বাদল। তার মৃত্যুর পর সেতুর মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদ।

Sharing is caring!