অভিবাসীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাচ্ছে লিবিয়ার বাহিনী

লিবিয়ার নিরাপত্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী কিশোরীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। ত্রিপোলিতে শারা আল জাওয়াইয়া আটক কেন্দ্রে বন্দি অভিবাসী কিশোরীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।

তারা বলছেন, লিবিয়ায় চোরাচালানকারী এবং পাচারকারীদের মধ্যে অনেক মিলিশিয়া সদস্য রয়েছে যারা দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসীদের উপর বর্বর নির্যাতন করে আসছে। তবে অধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘও বলে আসছে লিবিয়ায় সরকার পরিচালিত আটক কেন্দ্রগুলোতেও নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

এসব অভিযোগ উঠার পর শারা আল জাওয়াইয়া আটক কেন্দ্রে কিশোর-কিশোরীদের নির্যাতনের ঘটনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন সোমালিয়ার এক কিশোরী৷ ১৭ বছর বয়সি এই কিশোরী ইউরোপে প্রবেশের সময়কালে কুখ্যাত মানবপাচারকারীদের হাতে বন্দি হন। পরে তাদের হাতে যৌন নির্যাতনের শিকার হন তিনি। চলতি বছরের শুরুর দিকে লিবিয়ার নিরাপত্তাবাহিনী তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু তাতেও তার উপর চালানো যৌন নির্যাতন শেষ হয়নি। এমনকি লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতেও তাকে বারবার যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

সংবাদ সংস্থা এপিকে ভুক্তভোগী কিশোরী বলেন, এখনো তার উপর যৌন নির্যাতন অব্যাহত আছে৷ আগে তিনি মানবপাচারকারীদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন আর এখন সমুদ্র থেকে উদ্ধারের পরে ত্রিপোলিতে সরকার পরিচালিত একটি আটক কেন্দ্রে প্রহরীদের হাতে নির্যাতিত হতে হচ্ছে।

ওই কিশোরী আরও জানান, তার সাথে অপর চারজন সোমালিয়ান কিশোরী শারা আল জাওয়াইয়া আটক কেন্দ্র থেকে মুক্তি পেতে আবেদন করেছেন। এই আটক কেন্দ্রটি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য লিবিয়ার অভিবাসন দপ্তর দ্বারা পরিচালিত একটি কর্মসূচির অংশ। ভূমধ্যসাগর পার হয়ে অবৈধভাবে আসা আফ্রিকান অভিবাসীদের ঠেকাতে লিবিয়াকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে যেসব আটক কেন্দ্র এবং স্থাপনাকে সহায়তা দিচ্ছে শারা আল জাওয়াইয়া সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

একটি গোপন মোবাইল ফোনে এই কিশোরী জানান, ‌‘এরকম না যে আমি এই প্রথম যৌন নির্যাতনের শিকার হলাম। তবে এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক যখন আমাদের রক্ষার দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তা বাহিনী আমাদের ওর নির্যাতন চালায়।’

দুঃখের সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরে জানান, ‘বাথরুমে যেতে, পরিবারকে কল করতে বা মারধর থেকে বাচঁতে সবসময় আমাদেরকে কিছু না কিছু প্রস্তাব দেয়া হতো যেগুলো পূরণ না করে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার কোন সাহস আমি সহ অন্যদের নেই। মনে হচ্ছে আমরা যেন ঠিক আগের মতো পাচারকারীদের দ্বারা আটক আছি৷’’

বেলাডি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসে কর্মরত মানবাধিকার কর্মী তারিক লামলুম এপিকে জানান, ‘দেশব্যাপী বেশ কয়েকটি আটক কেন্দ্রে অভিবাসীদের উপর যৌন সহিংসতা এবং নির্যাতনের ঘটনা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়েছে।’

এ বিষয়ে ইউএনএইচসিআর কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরীয় বিশেষ দূত ভিনসেন্ট কোচেটেল বলেছেন, ‘সরকারি আটক কেন্দ্র এবং পাচারকারীদের কারাগারে ঘটা প্রায় ১০০টি যৌন নির্যাতনের অভিযোগ সংস্থাটির কাছে এসেছে। এর মধ্যে সরকারি আটক কেন্দ্রের প্রহরীদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে ধর্ষণ এবং সন্তান জন্মদানের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক এই সংস্থাটি।’

কিশোরীদের এই গ্রুপটিকেই কেবল শারা আল জাওয়াইয়ার আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এটি এমন একটি আটক কেন্দ্র যেখানে সাধারণত স্বল্প সময়ের জন্য অভিবাসীদের রাখা হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে আটক ওই মেয়েদের মুক্তি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।

ফেব্রুয়ারিতে পাচারকারীদের কাছ থেকে তাদের উদ্ধার করার পরে, ১৭বছর বয়সি ওই নারীকে আরও আটজন কিশোরীর সাথে শারা আল জাওয়াইয়ায় নিয়ে আসা হয়েছিলো। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অপর চারজনকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার চাপে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল।

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ‘তারা এখনও শারা আল জাওয়াইয়ায় বন্দি থাকা পাঁচ কিশোরীর মুক্তি এবং পরবর্তীকালে তাদের লিবিয়া থেকে ফেরত নিতে লিবিয়ার কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছে।’

Sharing is caring!