নাগরিক টিভি অনুসন্ধান: সিলেট এমসি কলেজের ঘটনায় আজাদ ,রণজিৎ, দেবাংশু মিঠু এবং জাহাঙ্গীরের মতো ছাত্রলীগের কুখ্যাতরাই ধর্ষণের মদদদাতা

ছাত্রলীগের কুখ্যাতদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া পোস্টার

ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, সৈয়দ মুজতবা আলী, জসীম উদ্দীনের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে শতবর্ষী এই বিদ্যাপীঠ। এই কলেজেরই শিক্ষার্থী ছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও শাহ এ এম এস কিবরিয়া, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদসহ অসংখ্য গুণী। দেশসেরা নাগরিক তৈরি করা এই বিদ্যাপীঠ এখন পরিণত হয়েছে ছাত্রলীগের অপরাধকর্মের আস্তানা। কলেজ ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাস দখল করে একের পর এক অপকর্ম করে চলেছে দলটির ক্যাডাররা।

‘বিশ্ব ঐতিহ্যের’ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া কলেজ ছাত্রাবাস ২০১২ সালে পুড়িয়ে দিয়েও পার পেয়ে যায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। আর ৮ বছর পর একই ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা দিয়ে অপরাধের ষোলোকলা পূর্ণ করেছে ছাত্রলীগ। ছাত্রাবাসে আগুন দেওয়া থেকে শুরু করে গণধর্ষণের ঘটনায় ঘুরেফিরে অভিযুক্ত হিসেবে আলোচিত হচ্ছে ছাত্রলীগের একই গ্রুপের নাম।

২০১২ সালের ৮ জুলাই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় ছাত্রলীগ ও শিবির মিলে আগুন দেয় ছাত্রাবাসে। আধিপত্যের আগুনে পুড়ে ছাই হয় ছাত্রাবাসের ৪২টি কক্ষ। এরপর থেকে ছাত্রাবাস থেকে বিতাড়িত হয় ছাত্রশিবির। পুড়িয়ে দেওয়া ঐতিহ্যবাহী ‘আসাম প্যাটার্নের’ ছাত্রাবাস পরিদর্শনে এসে অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। এ ঘটনায় গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি ছাত্রলীগের ১০ জন ও ছাত্রশিবিরের ১৯ জন নেতা-কর্মীকে দায়ী করে। তদন্তে দায়ী সাব্যস্ত হওয়া ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে ছিলেন দেবাংশু দাস মিঠু, জাহাঙ্গীর আলম, পংকজ পুরকায়স্থ, মো. আলমগীর, মৃদুল কান্তি সরকার, কামরুল ইসলাম, শ্রমিক লীগ নেত আবু সরকারসহ আরও তিনজন। ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনায় একাধিক মামলা হলেও এখনো শাস্তির আওতায় আসেনি কোনো অপরাধী। গত ১৩ মে ফ্রিতে ‘পাঁঠা’ (ছাগল) না দেওয়ায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা মারধর করে আহত করে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কাজী আশরাফকে।

নাগরিক টিভির অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে ছাত্রলীগ নেতা দেবাংশু দাস মিঠু ও জাহাঙ্গীর আলম ঘটনার দিন এমসি কলেজের গেট এ থেকে পুলিশ এর উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। ধর্ষণ করে ধর্ষকদের দ্রুত পালিয়ে যেতে তারাই সহযোগিতা করেন এবং গেট এর সামনেই পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নারী নাগরিক টিভিকে জানিয়েছে এলাকায় কোনো নতুন বাড়ির কাজ শুরু হলে এই জাহাঙ্গীরকে চাঁদা প্রদান না করলে বাড়ি করতে দেয়া হয় না। তাছাড়া এলাকার সুন্দরী যুবতীদের দিকে জাহাঙ্গীর বা তার সঙ্গে তারা ক্যাডার বাহিনীর চোখ পড়লে সেই মেয়ের পক্ষে এদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে বাঁচা সম্ভব হয়না। এলাকাতে মদ, ইয়াবা , গাজা সহ সকল মাদকদ্রব্যের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে থাকে এই জাহাঙ্গীর গ্যাং। কাউন্সিলর আজাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে এ ঘটনা ধামাচাপা দেবার জন্য পুলিশকে প্রভাবিত করার । আজাদ যে বাড়িতে থাকেন সেটিও দখলকৃত।

এদিকে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কাজী আশরাফকে মারধরের নেতৃত্বদানকারী কনক পাল অরূপ, রাহুল চৌধুরী, অপু তালুকদার ও মিঠু তালুকদারসহ সবাই জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার গ্রুপের নেতা-কর্মী। হামলার সময় অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকার নিজেও উপস্থিত ছিলেন। ২০১৬ সালে এমসি কলেজে পরীক্ষা দিতে এসে রক্তাক্ত হন সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা বদরুল ইসলাম প্রকাশ্যে কুপিয়ে আহত করেছিলেন খাদিজাকে। এ ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের হাতে কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও নিরাপদ ছিলেন না।তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দলের কর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধর করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিত তারা।

ছাত্রদলের মিছিলে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনায় আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সমন ইস্যু করে। হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাই রণজিৎ সরকার গ্রুপের নেতা-কর্মী ছিলেন। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস থেকে তুলে নিয়ে স্বামীকে বেঁধে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তরাও সবাই ওই গ্রুপেরই কর্মী। ঘটনাটি ধাপাচাপা দিতেও সক্রিয় ছিলেন গ্রুপের সিনিয়র কয়েকজন নেতা। ঘটনার পর অভিযুক্তদের সঙ্গে অ্যাডভোকেট রণজিৎ সরকারের ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। ওই গ্রুপের এক ছাত্রনেতার মোবাইল ট্র্যাক করে এখন পর্যন্ত গণধর্ষণ মামলার ৪ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গণধর্ষণের ঘটনার পর অভিযুক্তদের সঙ্গে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য নাজমুল ইসলামের ছবিও ভাইরাল হয়। অভিযোগ রয়েছে কলেজ ক্যাম্পাস ও ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের সব অপকর্ম দেখাশোনা করতেন তিনি। গণধর্ষণের ঘটনায় সিলেটজুড়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতারাও ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা রাখারও অনুরোধ জানিয়েছেন তারা। পাশাপাশি তারা করোনা মহামারীকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা অবস্থায় ছাত্রাবাসে সন্ত্রাসীদের থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় কলেজ অধ্যক্ষের পদত্যাগও দাবি করছেন। ছাত্রলীগের অপকর্মের জন্য ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজ বারবার কলঙ্কিত হওয়া প্রসঙ্গে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল আজিজ বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতির যে হাল তাতে এখন কেউ হোস্টেল সুপারই হতে চান না। কারণ হোস্টেল সুপারের কিছু করার থাকে না। ২০১২ সালে ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনার বিচার হয়নি।

রাজনৈতিক শেল্টারেই এসব হচ্ছে। এখন যারা গণধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছে তাদেরও রাজনৈতিক শেল্টার রয়েছে। তবে আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করি। যাতে আগামীতে এরকম ঘটনা আর না ঘটে।’ এমসি কলেজের বিদায়ী অধ্যক্ষ অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘রাজনীতির ওপর লেভেলের চেইন অব কমান্ড যদি ঠিক না থাকে, তাহলে এমসি কলেজে কিছুদিন পরপর যেসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে তা বন্ধ হবে না। এরকম ছাত্ররাজনীতিতে যদি রাজনৈতিক নেতারা শেল্টার দেন তাহলে আমাদের মতো শিক্ষকদের কিছু করার থাকে না। রাজনৈতিক নেতারা এসব কর্মীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেন, কিন্তু এর ফল ভোগ করতে হয় কলেজ কর্তৃপক্ষকে। আমি অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় অনেকবার পুলিশকে হোস্টেল তল্লাশির কথা বলেছি, কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে পুলিশ তল্লাশি করেনি।’

Sharing is caring!