সততার অভিনয় করা মন্ত্রীরও ছিল কালো টাকা

মন্ত্রিপরিষদ থেকে শুরু করে নিজ এলাকায় সততার বুলি আওরান তিনি। সব সময় সততার একতা অভিনয় করতেন আওয়ামী লীগের এই এমপি কিন্তু তার বিরুদ্ধেই দেশের একটি গণমাধ্যম কালো টাকা সাদা করার অভিযোগ তুলেছে। আরও নানা অভিযোগে অভিযুক্ত তিনি। এসব অভিযোগের বেশিরভাগেরই সঠিক উত্তরও দিতে পারেননি তিনি।

এতক্ষণ যার কথা বলছিলাম তিনি হলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে ৬৬ লাখ কালো টাকা সাদা করেছেন তিনি। তার আয়কর নথিতে এ তথ্য উল্লেখ রয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তিনি এই টাকা সাদা করেন।

আয়কর নথির তথ্যমতে, তিনি মন্ত্রী হওয়ার আগেই কালো টাকা সাদা করেছেন। দুর্নীতিবিরােধী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোন জনপ্রতিনিধি কালো টাকা সাদা করলে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে- তিনি কালাে টাকার মালিক কেন? তাই এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা,ছাড়া তিনি যে কোন সময়ই কালো টাকা সাদা করুন না কেন, তিনি আইন অনুযায়ী জবাবদিহির আওতায় আসবেন।

মন্ত্রী হিসাবে তিনি ২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। শপথের দিন তাকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন। পূর্ত মন্ত্রণালয়ে থাকার সময়। বিভিন্ন অভিযোগে তিনি আলচনায় উঠে এসেছিলেন। এখন সাফারি পার্ক ও চিড়িয়াখানায় প্রাণীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাতেও তিনি আলোচনায় এসেছেন।

তবে কালো টাকা সাদা করার অভিযােগটি সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম।

তিনি বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ছিলাম। আমি যখন যা আয় করেছি, আমার আয়ের টাকা ইনকাম ট্যাক্স ফাইলে দেওয়া আছে এক টাকাও হেরফের করা হয়নি।

কালো টাকা সাদা করা ছাড়াও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আরও কিছু গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা তৃতীয় পর্ব প্রকল্পের প্লট স্থানান্তর । নিয়ম অনুযায়ী তিনি প্লট পরিবর্তন করতে পারেন না তবু মন্ত্রী হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে তিনি তা করেছেন।

পাশাপাশি একই প্রকল্পে তার এক বন্ধুর নামে একটি প্লট বরাদ্দ নিয়েছেন তিনি সেই প্লটের আমমোক্তার হয়েছেন মন্ত্রী নিজে এবং তার ছোট ভাই এস এম নুর আলম সিদ্দিকী। এই ভাই বর্তমানে মন্ত্রীর পিএ হিসেবে নিযুক্ত আছেন। এ ছাড়া অনুসন্ধানে মন্ত্রীর বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে তার বিষয়ে পাওয়া বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মন্ত্রী হওয়ার এক মাস দুই দিন পর ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি শ ম রেজাউল করিম উত্তরায় রাজউকের তৃতীয় পর্বের প্রকল্পের ১৬/বি নম্বর ব্লকের ৩/এ নম্বর রোডের ২০ নম্বর প্লটটি পরিবর্তন করে ৭ নম্বর সেক্টরে ২নম্বর রোডে পাঁচ কাঠার ১৩ নম্বর প্লট নেন যদিও এর বেশ আগেই ২০১৬ সালের ১৬ জুলাই রাজউক চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে বরাদ্দকৃত প্লটের আইডি পরিবর্তন না করার নির্দেশনা দিয়ে রেখেছিল গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই আদেশ বহাল থাকার পরও শ ম ঐথ্য রেজাউল করিমের প্লটটি পরিবর্তন করা হয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রী প্রভাব খাটিয়ে এ কাজ করেছেন।

নথিপত্রে দেখা যায়, শ ম রেজাউল করিম গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী হওয়ার পাঁচ মাস পর তার জনৈক বন্ধু সুখরঞ্জন বেপারীকে উত্তরা তৃতীয় প্রকল্পের ১০ কাঠার প্লট পাইয়ে দেন। সুখরঞ্জনের প্লটের আবেদনে মন্ত্রী রাজউক চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে স্বহস্তে লিখে ১৩/এ ধারায় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এই ধারায় রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোন ব্যক্তির নামে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শ ম রেজাউল করিম তার হলফনামায় বার্ষিক আয় দেখান ৭৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা, আর বার্ষিক ব্যয় ৫০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৯২ টাকা। এই হিসাব অনুযায়ী তার বার্ষিক সঞ্চয় ২৬ লাখ ২৩ হাজার ৫০৮ টাকা। নগদ ও ব্যাংক হেরফের মিলিয়ে ওই সময় তার কাছে ছিল এক কোটি ৩২ লাখ টাকা । গত চার বছর তার এই হারে আয় হলে মোট সম্পদ দাড়ায় দুই কোটি ৩৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।

কিন্তু বিভিন্ন নথিপত্রে আমি পাওয়া তথ্য অনুযায়ী তার সম্পদের পরিমাণ এর চেয়ে বহু গুণ বেশি।

শ ম রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্ৰীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি তদন্ত সংস্থায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের নথিতে দেখা যায়, এ মন্ত্রীর নামে ঢাকার বাড্ডা পুনর্বাসন এলাকায় রাজউকের অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত বাড্ডা মৌজার ৮৯৪ নম্বর দাগে পূর্ব দিকের ১১ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্তে ১০ তলা বাড়ি রয়েছে। বাড়িটির নির্মাণ ব্যয় ১৫ কোটি টাকা।

রাজধানীর তোপখানা রোডের ৩৩ নম্বর ভবনে দুটি অফিস স্পেস, যার মূল্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। বাড্ডায় রয়েছে ২.৫০ শতাংশ, ৭.৫৫ ও ৪.৯৫ শতাংশ জমির তিনটি প্লট। এসব ছাড়াও রাজধানীতে ৪ শতাংশ জমিতে একটি বহুতল পাকা বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা।

ঢাকার মিরপুরে বড় সায়েক এলাকায় তিন কাঠার একটি প্লটে দেড় কাঠা জমিও কিনেছেন তিনি। মিরপুর পাইকপাড়ায় কেয়ারী বুরুজ ভবনেও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর বাইরে পিরােজপুর জেলায় নিজ উপজেলা নাজিরপুর ও আশপাশের এলাকায় কোটি টাকার জমি ক্রয় করেছেন শ ম রেজাউল করিম।

এ মন্ত্রীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়েও রয়েছে বিতর্ক মৎস ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ ম রেজাউল করিমের জন্ম ১৯৬২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে ১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর সময় তার বয়স ছিল ৯ বছর ১ মাস। এর পরও ২০০৫ সালের ১৪ মে প্রকাশিত গেজেটে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়।

প্রসঙ্গত, সরকারের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স সাড়ে ১২ বছর। তা ছাড়া ভারতীয় দলিল, লাল মুক্তিবার্তা বা অন্য কোন গেজেটে শ ম রেজাউল করিমের নাম নেই বলে নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

Sharing is caring!