১০০ কোটিতে ধামাচাপা বসুন্ধরার সাব্বির হত্যা


বসুন্ধরা গ্রুপের টেলিযোগাযোগ শাখার পরিচালক হুমায়ুন কবির সাব্বির হত্যা মামলা ধামাচাপা দিতে ১০০ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্মতিতে তার ছেলে তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর দলের খরচের নামে এ অর্থ দাবি করেন। পরে ৫০ কোটি টাকায় রফা হয়, যার ২০ কোটি টাকা পরিশোধ করেন আসামী সানবীরের বাবা বসুন্ধরার চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান (শাহ আলম)। লুৎফুজ্জামান বাবর রিমান্ডে থাকা অবস্থায় যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেলকে (টিএফআই) এসব কথা বলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। তিনি ব্রিটিশ কোম্পানি ওয়ার্ল্ডটেলের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার কথাও স্বীকার করেন বলে জানা যায়।
লুৎফুজ্জামান বাবরকে ২৮মে গুলশানের বাসভবন থেকে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা গ্রেফতার করেন। একটি বিশেষ টাস্কফোর্স তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আজ রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সাব্বির হত্যা, ওয়ারিদ টেলিকমের সঙ্গে লেনদেন, পুলিশের পোশাক কেনা, অস্ত্র কেনার দূর্নীতি, পুলিশের বেতারযন্ত্র কেনার দূর্নীতি, র্যা ব-পুলিশের জন্য গাড়ি কেনা ও ওয়ার্ল্ডটেলের সঙ্গে লেনদেনে জড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করেন।
সাব্বির হত্যাঃ ¬বসুন্ধরা গ্রুপের টেলিযোগাযোগ শাখার পরিচালক হুমায়ুন কবির সাব্বির গত বছরের চার জুলাই রাতে গুলশানের একটি বাসায় খুন হন। হত্যাকান্ডের তদন্তে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান ও তার ছেলে সানবীরের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠলে তারা বিষয়টি ধামাচাপা দিতে বাবরের কাছে যান। এরপর হত্যাকান্ডটি ধামাচাপা দিতে বাবর ও তারেক বসুন্ধরা গ্রুপের কাছে ১০০ কোটি টাকা দলের খরচের নামে দাবী করেন। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগন খালেদা জিয়ার সম্মতি ছিল। পরে ৫০ কোটি টাকায় বিষয়টি রফা হয়। এর মধ্যে ২০ কোটি টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়।
সূত্র জানায় বাবর স্বীকার করেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলের চাপের কারণে পুলিশ মামলাটি দায়ের করে। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। জিজ্ঞাসাবাদে বাবর বলেন, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের চাপের কারণে মামলার অভিযোগপত্র দিতে ব্যর্থ হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার জন্য তিনি মামলাটি রেখে দেন। তিনি স্বীকার করেন, সাব্বির হত্যার মামলাটি তিনি প্রতিদিন নিজে তদারকি করতেন। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের সঙ্গে তিনি গোপন বৈঠক করেন। হত্যা মামলার আসামী সানবীরকে দেশ থেকে তিনি পালাতে সাহায্য করেন বলেও স্বীকার করেন। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার রাজ্জাক মামলাটি তদন্ত করছেন।
ওয়ার্ল্ডটেলঃ সূত্রমতে, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর স্বীকার করেন, গত বছরের শেষ দিকে ব্রিটিশ কোম্পানি ওয়ার্ল্ডটেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নাইম এম চৌধুরী বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রস্তাব করেন। তিনি বাবরের মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে চান। বাবর বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মাধ্যমে ওয়ার্ল্ডটেলের বিনিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করেন। এর এক পর্যায়ে বেগম জিয়ার বড় বোনের ছেলে শাহরিন ইসলাম তুহিন বিষয়টি তার মাধ্যমে প্রস্তাব করেন। যার বিনিময়ে এ প্রতিষ্ঠানের ৩০ শতাংশ শেয়ার দলের জন্যে দেয়া হয়। এ ছাড়া ১০ শতাংশ শেয়ার বাবরের দুবাই প্রবাসী বন্ধু মাহতাব কেনেন। বিনিয়োগে সফলতার জন্য নাইম তার অংশের চার শতাংশ, মাহতাব তার অংশের আরও দুই শতাংশসহ মোট ছয় শতাংশ শেয়ার বাবরকে দেন। এ অংশ সিঙ্গাপুরের একটি কোম্পানির নামে দেখানো হয়। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে নাইম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এ অভিযোগ সত্য নয়। ওয়ার্ল্ডটেল এ ধরণের কোন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত নয়।
গাড়ি কেনায় দুর্নীতিঃ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জিজ্ঞাসাবাদে র্যানব ও পুলিশের জন্য ১২টি সাঁজোয়া যান ও ১১টি যানবাহন কেনাকাটায় দুর্নীতির কথা স্বীকার করেন। এসব কেনাকাটা থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ ঘুষ নেন বলেও জানান। তিনি জানান, বিভিন্ন পন্থায় সর্বনিন্ম দরদাতাকে কাজ না দিয়ে অন্য কোম্পানিকে দেওয়া হতো। এ ব্যবস্থায় সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক মটরসকে সব কাজ দেওয়া হতো। বিনিময়ে এবি ব্যাংকসহ তার সব ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা হয়। বাবর স্বীকার করেন দরপত্র রদবদলের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে প্যাসিফিক মটর্সকে সুযোগ দেয়া হয়। অপরদিকে প্যাসেফিক মটর্স বেশি দাম দেখিয়ে (ওভার ইনভয়েসিং) গাড়ি আমদানি করে সরকারকে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করে। বাবর স্বীকার করেন, মন্ত্রী হিসেবে তার এ কাজ করা ঠিক হয়নি।
ওয়ারিদের সঙ্গে লেনদেনঃ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ধাবি গ্রুপের ওয়ারিদ টেলিকম তরঙ্গ বরাদ্দের জন্য এক কোটি ডলার ঘুষ দিয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ডলার নিয়েছেন আলী আসগার লবী, বাকি ৯০ লাখ ডলার নেন আরাফাত রহমান কোকো। বাবর বলেন, তিনি নিজেও ওই দরপত্র থেকে প্রচুর অর্থ পেয়েছেন। বিআরটিএর চেয়্যারম্যান ওমর ফারুক তার ঘনিষ্ঠজন হওয়ার কারণে তিনি এ বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেন। বাবর জানেন, দুবাই হয়ে আমেরিকা যাওয়ার সময় তিনি ধাবি গ্রুপের রাজকীয় আতিথেয়তা নেন।
এ ব্যাপারে জানতে ওয়ারিদের মহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) নাভিদ সাঈদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
টিএন্ডটির যন্ত্রপাতি কেনাঃ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জানান, টিএন্ডটিতে খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের কাজ একটি চীনা কোম্পানীকে পাইয়ে দেয়ার জন্য আরাফাত রহমান কোকো ও অর্থমন্ত্রীর ছেলে নাছের রহমান (টনি) বিপুল অর্থ ঘুষ নেন।
পুলিশের পোষাকঃ সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর জানান,তারেক রহমান ও সাইদ ইস্কান্দারের প্রতিষ্ঠান ড্যান্ডি ডাইংকে কাজ দেওয়ার জন্য পুলিশের পোশাক ও মনোগ্রাম বদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় । এ কাজে ১৫ কোটি টাকার নতুন নতুন কাপড় তৈরি ও মনোগ্রাম সরবরাহের কাজ বেনামে তারেক রহমান ও তার মামা সাঈদ এস্কান্দারের প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয় ।
অস্ত্র কেনাঃ বিএনপির সরকারের আমলে ব্যার ও পুলিশের অস্ত্র কেনার দুর্নীতির কথা স্বীকার করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী । জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান , অস্ত্র কেনারইয় তিনি নিজেও হাওয়া ভবনে অস্ত্র প্রতি ১০০ ডলার করে নিয়েছেন । এতে তারা প্রায় দুই কোটি টাকা পান । ব্যারেব সাব মেশিনগান কেনার জন্য পাকিস্তানে গিয়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব পাঁচতারা হোটেলে থাকেন । নিয়ম্নীতি উপেক্ষা করে এসব কাজ দেওয়া হত্তো বলে তিনি স্বীকার করেন ।
বেতারযন্ত্র কেনাঃ বাবর স্বীকার করেন, গত পাঁচ বছরে পুলিশের জন্য ৩০ কোটি টাকার বেতারযন্ত্র কেনা হয়েছে। এতে ১০ কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি হয়েছে। এসব যন্ত্রের মধ্যে ২০০৩-২০০৪ অর্থবছরে ৫০০টি এফএম বেতার ও এক হাজার ব্যাটারি কেনা হয়। একইভাবে ১৫০টি স্থায়ী যন্ত্র কেনায় আড়াই কোটি টাকার দুর্নীতি হয়। খুলনা পুলিশের জন্য নিয়মনীতি ছাড়া বেতারের রিপিতার কেনায় দুর্নীতি হয়।
এসব কেনাকাটা-দুর্নীতি নিয়ে জানতে চাইলে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, এসব দুর্নীতির খেসারত এখন পুলিশকে বহন করতে হবে। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের জন্য গাড়ি কেনা হয়েছে ৬৫ লাখ টাকা দামে। ওই গাড়ি চালাতে হলে যত তেল প্রয়োজন তা দেওয়ার ক্ষমতা পুলিশের নেই। এসব গাড়ি কেনার আগে জ্বালানী ব্যবহারের বিষয়টি ভাবা উচিত ছিল। তা ছাড়া পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ ও বদলিতে দুর্নীতি হয়েছে বলে আইজি জানান। তিনি বলেন, পুলিশের বেতারযন্ত্র কেনার জন্য আরাফাত রহমান কোকো একসময় চাপ সৃষ্টি করেছিলেন।
সম্পত্তির বিবরণঃ বাবর জিজ্ঞাসাবাদে জানান, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তার সোয়া বিঘার পাঁচটি প্লট আছে। কারওয়ান বাজারে দুটি ফ্ল্যাট দিয়ে মিরাকল নামে তার একটি প্রতিষ্ঠান আছে। তার ভাবীর নামে তিনি এটা কেনেন। স্বদেশ আবাসিক এলাকায় তার ছয়টি প্লট, উত্তরায় চাচাতো ভাইয়ের নামে ইজারা নেওয়া তিন একর জমি ও সন্তানদের নামে ডিপিএস আছে। তার ঋণের মধ্যে সোনালী ব্যাংকে আট কোটি, আল-বারাকা ব্যাংকে পাঁচ কোটি ও পূবালী ব্যাংকে দেড় কোটি টাকা ঋণ আছে।
তিনি স্বীকার করেন, ২০০২ সালে তারেক রহমান তার ঋণ হালনাগাদ করার জন্য ৪০ লাখ টাকা দেন। গত বছর ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করিম তাকে দেড় কোটি টাকা দেন এবং ২০০৭ সালের নির্বাচনের আগে তারেক রহমান দেন ৫০ লাখ তাকা। দলের খরচ ও নির্বাচনের জন্য তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। এর মধ্যে বসুন্ধরার কাছ থেকে নেন ৫০ লাখ টাকা।
সূত্রঃ প্রথম আলো ৩ জুন-২০০৭

Sharing is caring!