এবার চিনির বাজার অস্থির

চাল, তেল ও মাংসের পর এবার চিনির বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। কোনভাবে এই পণ্যের দরের লাঘাম টেনে ধরতে পারছে না সরকার। ফলে দেশে হাতে গোনা প্রতিষ্ঠান চিনির বাজারকে অস্থির করে তুলছে। সঙ্গে ক্রেতার পকেট কেটে লুটে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।

দুর্দিনের বাজারে দুর্মূল্য চিনির। চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ বেশিরভাগ নিত্যপণ্যের দামে ছড়াচ্ছে উত্তাপ। এরই মধ্যে বেসরকারি পরিশোধিত চিনিকল এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিএসএফআইসি উৎপাদিত চিনির দাম আরও বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে কোম্পানি ভেদে কেজিতে খোলা চিনির দাম ২ থেকে ৩ এবং প্যাকেট চিনি ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর আগে এক দফায় খোলা চিনির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫ টাকা। রোজা শুরুর আগ মুহূর্তে অস্থির হলো চিনির বাজার। পাইকারি ও খুচরায় দাম বাড়ছে একই হারে। খুচরা বাজারে চিনি বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৭২ টাকা, যা দু’দিন আগেও ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা। গত মাসে এই চিনি ছিল ৬৪ থেকে ৬৫ টাকা।

বাজারগুলোতে এখন পরিশোধিত কোম্পানির আমদানি করা চিনির প্যাকেট ৭৮ এবং বিএসএফআইসির প্যাকেটজাত আখের চিনি ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৭০ টাকা। এদিকে বিএসএফআইসির আখের খোলা চিনি কিনে প্যাকেটজাত করছে গাংচিল ফুড প্রডাক্টসসহ বিভিন্ন কোম্পানি। এসব কোম্পানি আখের প্যাকেট চিনি বিক্রি করছে ৮৫ টাকায়। এ চিনি গত মাসেও ছিল ৭৫ টাকা। আবার অনলাইনে আখের চিনি সর্বোচ্চ ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্যাকেট চিনির দাম পাঁচ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এই দফা বাড়ার ফলে গত দুই মাসে সব ধরনের চিনির কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা।

এ বিষয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, এবার রোজা শুরু হবে লকডাউনের মধ্যে। এ সময়ে নিত্যপণ্য সরবরাহ পর্যাপ্ত রাখতে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা লকডাউনের বাইরে থাকবে। লকডাউনে দ্রুত পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে। তিনি বলেন, রমজানের বাজারে পর্যাপ্ত চিনি সরবরাহ করবে বিএসএফআইসি। সংস্থাটির ডিলাররা খোলা চিনি ৬৩ এবং প্যাকেট চিনি ৬৮ টাকায় বিক্রি করবে। নির্ধারিত খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবুল হাশেম বলেন, বিশ্ববাজারে চিনির দর কমছে। তাই পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে চিনির বিক্রয় আদেশের দরও কমেছে। এই বাজারে গতকাল প্রতি কেজির দর ছিল ৬২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৬৩ টাকা। অথচ মিলগেটে চিনির দাম ৬৪ টাকা। আবার বাজারেও পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৬৮ টাকায়। গত ২ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে চিনির দামে তেমন হেরফের ঘটেনি। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত প্রতি পাউন্ড চিনির গড় দাম ছিল ছিল ৩৫ সেন্ট। এর আগের তিন মাস ছিল ৩১ সেন্ট।

ক্রেতাদের অভিযোগ: দেশের এমন দুর্যোগে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নিচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান। উত্তর পীরেরবাগের বাসিন্দা অটোরিকশা চালক জালাল আহমেদ বলেন, বাজারে দাম বাড়তে থাকায় কিছুদিন আগে টিসিবি সব পণ্যের দাম বাড়িয়েছে। এবার চিনি খাদ্য করপোরেশনও বাড়াল। বেসরকারি কোম্পানিগুলো দিন দিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে চলছে। এ পরিস্থিতিতে কঠোর লকডাউনের মধ্যে একদিকে আয় বন্ধ হবে, অন্যদিকে বাজারে পণ্য কিনতে বাড়তি টাকা গুনতে হবে। রমজানে চিনির চাহিদা বাড়ে। অথচ এই পণ্যের দামও বাড়ছে।

একই কথা বলেন মোহাম্মদপুর টাউনহল বাজারের ক্রেতা বেসরকারি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, করোনা মহামারি জীবনে দুর্যোগ এনেছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও বাজারে পণ্যের দামে দুর্যোগ নিয়ে এসেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও দাম বাড়াল: গতকাল রোববার শিল্প মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সভায় রমজানে চিনির বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) চিনি বিক্রয় কার্যক্রম সম্পর্কিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়। এ সময় বিএসএফআইসি চেয়ারম্যান মো. আরিফুর রহমান অপু সমকালের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, চিনির দাম বাড়ানোর জন্য দেওয়া প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেয়েছে। বিএসএফআইসিকে সুরক্ষা দিতেই চিনির দাম বাড়ানো হচ্ছে। কারণ, এক কেজি চিনির উৎপাদন খরচ ২০০ টাকা। নতুন দর অনুযায়ী, খোলা চিনি ৬৩ ও প্যাকেট চিনি ৬৮ টাকা। খোলা চিনিতে তিন টাকা কমিশন পাবে ডিলার। এ কারণে ডিলাররা ৬৩ টাকা কেজিতে বিক্রি করবে। এ দামে বিক্রির পর অনেক ভর্তুকি দিতে হয়।

নতুন দর অনুমোদন পেয়েছে গত মঙ্গলবার। এরপর থেকে বাড়তি দামে চিনি বাজারে বিক্রি করছে বিএসএফআইসি। যদিও সংস্থাটি বাজারের চাহিদার তুলনায় সামান্য চিনিই বিক্রি করে। কিন্তু এই সংস্থার দরে বাজার প্রভাবিত হয়। দেশে চিনির চাহিদা বছরে ১৮ থেকে ২০ লাখ টন। এর মধ্যে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন চিনি বিএসএফআইসি উৎপাদন করে বাজারে ছাড়ছে। তবে রমজানে চিনির চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় তিন লাখ টন। এই সময়ে বাজারে চিনির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ৪৪ হাজার টন চিনি বিক্রির প্রস্তুতি রয়েছে সংস্থাটির। এ ছাড়া রমজানে চিনির দামে ভর্তুকি দিয়ে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে টিসিবি। সংস্থাটি গত মাসেও ৫০ টাকা কেজি দরে চিনি বিক্রি করেছে।

Sharing is caring!