ডক্টর তাজ হাশমীর সাথে ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর বিতর্ক – একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ।

ফারুক ফেরদৌসের ফেসবুক ওয়াল থেকে।

ডক্টর তাজ হাশমীর সাথে ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর বিতর্ক শুনলাম। আগেও একবার বলেছি, এ সব বিতর্ক বা টকশোতে আসলে কথার প্রদর্শনীই হয়, সত্য মিথ্যার ফয়সালা হয় না। রসূল সা. এ রকম কথার প্রদর্শনী সম্পর্কেই বলেছেন, ‘বাগ্মিতা অনেক সময় জাদুর মত হয়’। বাগ্মিতা দিয়ে সত্যকে মিথ্যা বানানো যায়, মিথ্যাকে সত্য বানানো যায়। এরকম কথার প্রদর্শনী টাইপ তর্কে আসলে কৌশলেরই জয় হয়, জ্ঞানের না, সত্য মিথ্যারও না।

কোনো আলেমের উচিত না দীন নিয়ে এরকম বিতর্কে অংশগ্রহণ করা। আলেমদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের হেদায়াত, মানুষকে বিতর্কে পরাস্ত করা না। অথচ এ রকম বিতর্কে প্রতিপক্ষের পরাজয়ই হয়ে ওঠে মূল উদ্দেশ্য। সে জন্য অনেক অপকৌশল, কুরআন হাদীসের অপব্যাখ্যার আশ্রয় নিতেও দ্বিধা থাকে না।

আগের এক দুইটা বিতর্কে আব্বাসী সাহেবের কথা মোটামুটি ভালো লেগেছিলো। কিন্তু এই বিতর্কে তার অবস্থান হাস্যকর লেগেছে। তিনি একাধিক আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা বা অপব্যাখ্যা করেছেন, অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন।

তাজ হাশমী সাহেব শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন খবরে ওয়াহেদের সুবুত বা প্রামাণ্যতা নিয়ে। প্রথম থেকেই ইমাম আবু হানিফা এবং ইমাম মালেকের অবস্থানের কথা বলেছেন। তিনি যেহেতু আলেম নন, তার বক্তব্য তিনি হয়তো পরিষ্কার করতে পারেননি। মূলত ইমাম মালেক ও আবু হানীফার পরে শুরু হওয়া খবরে ওয়াহেদ নির্ভর ফিকহ চর্চা বা হাদীসের বড় সংকলনগুলো, তাদের নীতিতে সহীহ যয়ীফ নির্ধারণ এবং সবগুলো হাদীসের অকাট্য প্রামাণ্যতা নিয়ে তার প্রশ্ন আছে।

কিন্তু আব্বাসী সাহেব হাদীসের হুজ্জিয়ত বা নবীজির কথা শরয়ী দলিল হবে কি না সেই তর্ক শুরু করলেন। পুরোটা সময় তিনি ওই তর্ক করলেন। শেষে আবার হাশমী সাহেবকে হেদায়াত দেওয়ার দাবিও করলেন। এটা কি তর্কে জেতার অপকৌশল নাকি তিনি হাশমী সাহেবের কথা বুঝতেই পারেন নি জানি না।

নিজের বক্তব্য শক্তিশালী করার জন্য তিনি কুরআনের আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, আমি এই যিকির অবতীর্ণ করেছি আমিই এর হেফাযত করবো। এখানে ‘যিকর’ অর্থ কুরআন। গ্রহণযোগ্য সব মুফাসসিরের মত এটাই। অথচ আব্বাসী সাহেব এই আয়াতের দলিলে বললেন আল্লাহ হাদীস সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছেন।

কুরআনে আছে, ‘ইকতারাবাতিস সাআতু ওয়া-নশাক্কাল কামার’ অর্থাৎ ‘কিয়ামত নিকটবর্তী হয়েছে এবং চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়েছে।’ কুরআনে কোথাও বলা হয়নি, রসূল সা. চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করেছেন। অথচ আব্বাসী সাহেব এই তরজমা করলেন।

সৌদি বাদশাহদের পক্ষ নিয়ে তার তর্কও অদ্ভুত লেগেছে। হারামাইনের শাসক সব সময় আল্লাহর প্রিয় বান্দারা হবে এ রকম কোনো কথা নেই। ইসলাম বিদ্বেষী কারামেতা রাফেযীরাও দীর্ঘ দিন হারামাইন শাসন করেছে, হজ বন্ধ করে রেখেছে। তাতে কি তাদের মাসুমিয়্যত প্রমাণিত হয়েছে নাকি?

মেরাজের হাদীসের ব্যাখ্যা তিনি নিজের মতো করে করেছেন। কোনো গ্রহণযোগ্য শারেহ হাদীসটার এ রকম ব্যাখ্যা করেছেন বলে শুনিনি। তার আরও অনেক কথাই আপত্তিকর মনে হয়েছে। সব মনে পড়ছে না। আমি শুধু বলতে চাই দীনি বিষয়গুলো নিয়ে এ রকম উন্মুক্ত বিতর্ক হওয়া উচিত না। এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।

ড. তাজ হাশমী সাহেবের যে সব প্রশ্ন আছে, এ রকম প্রশ্ন আগেও অনেকের ছিলো। ইমাম মালেক নিজেই অনেক ক্ষেত্রে খবরে ওয়াহেদকে গুরুত্ব দেননি। মদীনার প্রচলিত আমলকে খবরে ওয়াহেদের ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। হানাফী মাযহাব মুহাদ্দিসদের কাছে সহিহ অনেক খবরে ওয়াহেদই গ্রহণ করেনি। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রে কতদূর যাওয়া যাবে, কোথায় থেমে যেতে হবে এই সীমাটাও বুঝতে হবে। এ সব বিষয়ে প্রচুর  বইপত্র আছে। আশা করি ড. তাজ হাশমী আরও বইপত্র পড়বেন, ভালো স্কলারদের সাথেও একান্তে আলাপ করবেন এবং কোনো বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা ও গভীর জ্ঞান অর্জনের পরই ওই বিষয়ে কথা বলবেন বা মন্তব্য করবেন।

Sharing is caring!