করোনায় হতদরিদ্রদের নাভিশ্বাস

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:

বাংলাদেশে চলছে সাতদিনের লকডাউন। এর মাঝেই আগামী ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত আবাও লকডাউন ঘোষণা করেছে ভোটারবিহীন আওয়ামীলীগ সরকার। ফলে সব ধরনের যানবাহন ও কাজ কর্মের প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কেউ বাহিরে যেতে পারছেন না, আবারও কেউ মুভমেন্ট পাস নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে মাইলের পর মাইল। কিন্তু বিপাকে পড়েছে হতদরিদ্র মানুষেরা। বিশেষ করে যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থল কাহিল। সব মিলে তাদের এখন নাভিশ্বাস অবস্থা।

জানা গেছে, এখন বাংলাদেশে করেনায় প্রায় ৫০ লাখ পরিবার দিন আনে দিন খায়। এসব পরিবারকে ভোটারবিহীন বাংলাদেশের সরকার মধ্যবিত্ত ও নিম্মবিত্ত বলে সংখ্যায় তুলেছে। এদেরকে সাহায্য দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ৯৩০ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবও তুলেছে তারা। কিন্তু এই টাকা হতদরিদ্ররা পাবেন কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সচেতন মানুষেরা। কারণ গতবার সাড়ে ১২শত কোটি টাকা সাহায্য দেয়ার কথা বলে পাস করা হয়েছিল। কিন্তু তালিকা হলেও ভুয়া লোকেরা বিশেষ করে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মচারীরাই তা লুটে খেয়েছেন।

মঙ্গলবার মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদের সামনে কথা হচ্ছিল ষাটোর্ধ আলীম উদ্দিনের সাথে। তিনি জানান, তার পরিবারে ৭ জন সদস্য। গত এক সপ্তাহ তিনি কোন আয় করতে পারেননি। ফলে এর মধ্যে দুদিন না খেয়ে দিন কেটেছে তাদের। এর ফাঁকে এক ব্যক্তির কাছে কয়েক কেজি চাল কেনার টাকা ধার করেছেন। তা এখন কাজ করে তাকে পরিশোধ করবেন। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত কেউ তাকে কাজে নেয়নি। একই সঙ্গে বসে ছিলেন শরীফুল। তার স্ত্রী, বাচ্চা, মা নিয়ে তিনি বছিলা এলাকায় থাকেন। লকডাউনের আগে তিনি ভ্যান চালাতেন। কিন্তু লকডাউনে সেটি আর পারছেন না। ফলে এখন মানুষের কাছে হাত পাতছেন তিনি। শরীফুল বলেন, আমি তো কোনদিন কারও কাছে হাত পাতি নাই। কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে চেয়ে খাচ্ছি।

জানা গেছে, চলতি মাসে দুই দফা লকডাউন চলছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ভোটারবিহীন সরকারের পক্ষ থেকে হতদরিদ্রদের সাহায্য করার জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যদিও ৯৩০ কোটি টাকার একটি কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সেই টাকা কবে দেয়া হবে আর কারা কারা পাবেন তা স্পষ্ট নয়। ফলে দরিদ্ররা কষ্টে দিনানিপাত করছেন।

আয় না থাকায় হতাশ চালক ইউনুস বলেন, ‘এখন কঠিন লকডাউন। গাড়ি বের করলেই মামলা। ছয় দিন পর রাস্তায় বাইর হইছি। রোডেঘাটের পরিস্থিতি ভালো না। যেখানেই যায় সেখানেই পুলিশের টহল। রাস্তায় ব্যারিকেড। এহন গাড়ি না চালাইলে আমরা খামু কী?’

কঠোর লকডাউনের প্রথম চার দিন ঢাকার ফাঁকা রাস্তায় হাতে গোনা কিছু অটোরিকশা চলাচল করেছে। তবে দুই দিন ধরে রাস্তায় অটোরিকশার পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। অনেকে আবার জরিমানার মুখোমুখি হয়েছেন। বেশির ভাগ সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বেকার ঘরে বসে আছেন। লকডাউন আরও সাত দিন বাড়ার খবর এসেছে। এই খবরে তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এভাবে আয়শূন্য হয়ে দিনের পর দিন ঘরে বসে থেকে সংসার খরচ কীভাবে জোগাড় করবেন-এটাই এখন বড় প্রশ্ন তাদের কাছে।

নিউমার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানে কাজ করেন আরিফ হোসেন। তিনি জানান, মাসে ১০ হাজার টাকা বেতনে তিনি এই দোকানে কাজ করেন। এই টাকা দিয়েই সংসারের খরচ চালান তিনি। কিন্তু লকডাউনের পর দোকান মালিক ঘোষণা দিয়েছেন, যত দিন লকডাউন থাকবে ততদিন বেতন দেয়া হবে না। তাই তারা মার্কেট খোলা রাখার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। অন্যথায় পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

বনানী এলাকায় রিকশা চালান সোহেল রানা। প্রতিদিন তার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু সোমবার বিকেল তিনটা পর্যন্ত তার আয় হয়েছে মাত্র ২৭০ টাকা। সোহেল বলেন, লকডাউনের কারণে সড়কে যাত্রী নেই। এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে নিয়মিত ত্রাণ সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।


করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্যসংকটে থাকা রাজধানীর নিম্ন আয়ের ভাসমান মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। সোসাইটির পক্ষ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান মানুষের মধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

১৪ এপ্রিল প্রথম রোজার দিন থেকে এই মানবিক কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই কার্যক্রম চলমান। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রতিদিন রাজধানীর ৩০০ ভাসমান অসহায় মানুষের হাতে রান্না করা খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দিচ্ছেন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা করোনাকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও নিশ্চিত করতে মনঃসামাজিক সহায়তা সেল চালু করেছে তারা।

জানা গেছে, অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দরিদ্রদের খাবার ও সাহায্য দিলেও ভোটারবিহীন অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধারা এখনো জনগনের পাশে দাঁড়ায় নি। তারা চুপ করেই বসে আছেন।

সচেতন মানুষেরা বলছেন, নেতারা বের হবেন, যখন সরকারি সাহায্য আসবে। তখন তারা সেলফি মেরে মেরে কোমর বেধে সাহায্য দেবেন। তবে আমাদের নয়, তাদের মনোপুত নেতাকমীদের। যারা তাদের ভোটের সময় জাল নিতে সহায়তা করেছে।

পেটের তাগিদে অনেকে ঘর থেকে বের হলেও পুলিশের বাঁধার মুখে পড়ছেন। পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে রাস্তায় রিকশা নিয়ে বেরিয়ে বিপাকে পড়েছেন।মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার চেয়ে রুটি রুজির ওপর আঘাতের বিষয়টি ঠিকভাবে মেনে নিচ্ছে না তারা।

এমন কয়েকজন দিনমজুর জানিয়েছেন, তাদের দুঃখ দেখার কেউ নেই।ঘরে খাবার নেই, রাস্তাই বের হয়েও কোন কাজ পাওয়া যাচ্ছে না। তার ওপর তো পুলিশের চেক আছেই। তাদের মতো গরীবের খবর কেউ রাখে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানা জরিপ অনুযায়ী করোনার আগে বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ২০.৫ ভাগ দারিদ্র্য সীমার নীচে ছিল৷ আর চরম দরিদ্র ছিল ১০ ভাগ৷

বিআইডিএস-এর সাম্প্রতিক জরিপে বলা হচ্ছে, করোনায় এক কোটি ৬৪ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে, দারিদ্র্য সীমার নীচে নেমে গেছে৷ তাই এখন দেশে গরিব মানুষের সংখ্যা পাঁচ কোটির বেশি৷

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর জরিপে দেখা গেছে, করোনায় ফর্মাল সেক্টরে কাজ করা ১৩ শতাংশ মানুষ চাকরি হরিয়েছেন৷

যাদের আয় ১১ হাজার টাকার কম তাদের ৫৬.৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, ৩২.১২ শতাংশের আয় কমে গেছে৷ যাদের আয় ১৫ হাজার টাকার মধ্যে তাদের ২৩.২ শতাংশের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে৷ ৪৭.২৬ শতাংশের আয় কমে গেছে৷ আর যাদের আয় ৩০ হাজার টাকার বেশি তাদের ৩৯.৪ শতাংশের কমেছে এবং ৬.৪৬ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে৷ এই জরিপে কিন্তু মধ্যবিত্তের ওপর করোনার অভিঘাত স্পষ্ট৷



Sharing is caring!