সারা শরীরে অসংখ্য খুন্তীর ছ্যাঁকা

সারা শরীরে অসংখ্য খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে নির্যাতনের চিহ্ন। হাত ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হাত মচকে দেয়া। প্ল্যায়ার্স দিয়ে মাথার চুল টেনে টেনে উঠিয়ে দেয়া। বুকের উপর দাঁড়িয়ে লাফালাফি। মায়ের বান্ধবীর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে এক বছর ধরে ঠিক এভাবেই নির্যাতনের শিকার হয় ১১ বছরের শিশু।

জানা গেছে, চিকিৎসাধীন ওই শিশুর নাম আমেনা খাতুন। সে সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের নূর ইসলাম ও আকলিমা খাতুনের মেয়ে। অমানবিক নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

বৃহস্পতিবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্মম নির্যাতনের শিকার যশোরের শিশু আমেনার (১১) মা আকলিমা খাতুন বলছিলেন, গত বছর করোনার আগে ছোটবেলার বান্ধবী শ্যামলী বৈরাগী আমার হাতেপায়ে ধরে বলল তোর মেয়ে আমেনাকে আমার কাছে দে। ঢাকায় আমার বাসায় দুটো বাচ্চা দেখাশুনা করবে। আমেনার থাকা খাওয়া মানুষ করার দায়িত্ব তার। সরল বিশ্বাসে বান্ধবীর হাতে মেয়েকে তুলে দিয়েছিলাম। মেয়েকে এমন নির্যাতন করেছে বুঝতে পারিনি।

তিনি এও জানান, আমেনার যখন দুই বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান। নানা মারা গেছেন জন্মের আগেই। বয়স যখন সাত বছর, তখন নানি জোহরা খাতুন মা আকলিমাকে আবার বিয়ে দিয়ে দেন। ভিক্ষা করে নানি লালন-পালন করতেন আমেনাকে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমেনা জানায়, শ্যামলী আন্টি তাকে ঢাকার মহাখালীতে সাততলা সরকারি কোয়ার্টারে নিয়ে যায়। সেখানে শ্যামলী আন্টি, তার স্বামী বাদল সিকদার ও আন্টির শাশুড়ি লিলি থাকেন। আন্টির শাশুড়ি সরকারি হাসপাতালের নার্স। ওই বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর দুই মাস সে ভালো ছিল। এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। বাড়ির কাজের একটু এদিক-ওদিক হলেই তাকে বেধড়ক মারপিট করত শ্যামলী ও বাদল।

আমেনা জানায়, তাকে দিয়ে বাসাবাড়ির সব কাজ করানো হতো। এর আগে আমেনা কোথাও কাজ করেনি বা শেখেনি। শুরু হলো রুটি বানানো দিয়ে। রুটির পরিমাণ কম হলে আমেনাকে মারপিট করা হতো। হাত থেকে পিরিচ পড়ে গেলে দেয়া হতো শাস্তি। সারা গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, হাত ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হাত মচকে দিয়েছে, প্লায়ার্স দিয়ে মাথার চুল টেনে টেনে উঠিয়ে দিয়েছে, গলায় এবং মাথায় আঘাত করেছে। দুই পায়ে পিটিয়ে ভেঙেছে রুটি বানানোর বেলন। শ্যামলীর স্বামী আমেনার পায়ের উপর দাঁড়িয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে; শ্যামলী বুকের উপর দাঁড়িয়ে লাফালাফি করেছে। আমেনার মুখে টেপ লাগিয়ে হত্যাচেষ্টাও করেছে।

একমাস আগে আমেনার নানি জোহরা খাতুন আমেনাকে দেখতে ঢাকায় যান। কিন্তু বাদল তাকে বাড়ি নেননি। তার কাকা তাকে মিরপুরের বাসায় নিয়ে যান। তাকে বলা হয়, শ্যামলী-বাদল বরিশালে বেড়াতে গেছেন। আমেনাকে তাদের সঙ্গে নিয়ে গেছেন। যশোরে ফিরে জোহরা খাতুন ফোন করে আমেনার জন্য কান্নাকাটি করেন। একপর্যায়ে এক সপ্তাহ পর আমেনাকে নিয়ে যেতে তার মা আকলিমাকে ফোন করেন শ্যামলী। পরে গত ২৩ মে তার নানি ঢাকায় গিয়ে আমেনাকে নিয়ে আসেন। এরপর ২৫ মে তাকে যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আমেনার মা আকলিমা বলেন, ফোন করলেই শ্যামলী বৈরাগী বলতেন, আমেনা ভালো আছে। ফোনে লাউড দিয়ে কথা বলাতেন। মেয়েটাকে শ্যামলীর কাছে দিয়েছিলাম ভালো থাকবে বলে। কিন্তু তার এই অবস্থা করবে ভাবতেই পারিনি। আমি আমার মেয়ে নির্যাতনের বিচার চাই।

হাসপাতালে আমেনাকে চিকিৎসা দেয়া যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অজয় কুমার সরকার জানান, তার শরীরে অসংখ্যা পোড়া বা ছ্যাঁকার দাগ ও নির্যাতনের চিহ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষত শুকিয়ে গেছে। অনেক দিন ধরেই এই ক্ষতগুলো হয়েছে। তাকে যথাযথ চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে।

যশোরে ফেরার পর আমেনাকে হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তিতে সহযোগিতা করা রক্তদাতা ও সামাজিক সেবামূলক সংগঠন ‘স্বজন সংঘ’র সাধারণ সম্পাদক সাধন কুমার দাস জানান, জোহরা খাতুন প্রথমে আমেনাকে নিয়ে গ্রাম্যডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করাচ্ছিলেন। এমন নির্যাতনের খবর পেয়ে তিনি ও তার সংগঠনের যুগ্ম-সম্পাদক সঞ্জয় কুমার নন্দী তাদের হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। মামলা করার জন্য যশোর কোতোয়ালি থানায়ও যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু থানা থেকে ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় মামলার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে বক্তব্য নেয়ার জন্য বাদল সিকদার ও শ্যামলী বৈরাগীর মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেননি।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তাজুল ইসলাম বলেন, ‌অভিযোগটি তিনি শুনেছেন। ভুক্তভোগীদের থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর ডিএমপির সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।

Sharing is caring!