সেজান জুসের কারখানায় পুড়লো ৫২ শ্রমিক: নাম নিয়ে লুকোচুরি !!

নকীব মাহমুদ, ঢাকা:
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সেজান জুসের কারখানায়
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ওই কারখানায় কাজ করা ৫২ শ্রমিক পুড়ে অঙ্গার হয়ে মারা
গেছেন। এ ঘটনায় আহতের সংখ্যা প্রায় কয়েক শতাধিক। প্রায় ২৪ ঘণ্টারও বেশি
সময় ধরে চেষ্টা চালিয়ে শুক্রবার দুপুরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগে
বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়।


কিন্তু এই কারখানার নামটি নিয়ে বাংলাদেশী মিডিয়াগুলো লুকোচিুর খেলছে। খোঁজ জানা
গেছে, কারখানাটি আওয়ামী লীগের নেতা ও সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল
হাসেমের। কিন্তু ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তাকে আটক বা গ্রেফতার কোনটাই
করা হয়নি। উল্টো তিনি তার পক্ষে সাফাই গেয়ে মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়েছেন।
আরও জানা গেছে, কোম্পানিটিতে সেজান জুস তৈরি হতো। এ কারণে স্থানীয় লোকজন
সেটিকে সেজান জুসের কোম্পানি বলতেন। কিন্তু সেজান জুসের নাম সরাসরি নিলে
ব্যবসায় ক্ষতি হবে বিষয়টি লুকাতে শব্দটি পরিবর্তন করে দেশীয় মিডিয়াগুলো সেটিকে
হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ বলে প্রচার করছে। এমনকী দেশের শীর্ষ দুটি দৈনিকও
তাই করছে। তাদের দেখে অন্যরাও একই পথে হাঁটা শুরু করেছে।


নাম বদলে অন্য নামে প্রচারের নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, সেজান জুস
থেকে প্রতি মাসে দেশীয় মিডিয়াগুলো অনেক বিজ্ঞাপন পান। সে কারণে মালিক
হাসেমকে খুশি করতেই পণ্যটির নাম বদলে মালিকের নামে তা প্রচার করা হচ্ছে।
বিষয়টি মিডিয়া ক্যু বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
এর কারণ হিসেবে নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন টকশোকার বলেন, সেজান জুসের
নাম যত প্রচার হবে সেজান জুসের ব্রান্ডভ্যালু তত শুয়ে পড়বে। সেজান জুসের
ব্রান্ডভ্যালু রক্ষা করতেই মিডিয়াগুলো ‘হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডে ‘ নাম
নিচ্ছে। কারণ কোন হাসেম না কাশেম সেটাতো ভোক্তা চেনে না। ভোক্তা চেনে সেজান
জুস। মিডিয়াগুলো কতবড় বাটপার। ভাবতে পারেন? যখন দরকার বারবার সেজান জুসের
নাম উঠে আসা, সেখানে তারা কায়দা করে হাসেমের নাম নিতাছে। এরাতো টাকার জন্য
নিজের বাপের নামও বেইচা দিতে পারে।


এদিকে একটি ইংরেজি দৈনিককে আজ শুক্রবার আবুল হাসেম বলেন, ‘‘নারায়ণগঞ্জের
রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সজীব গ্রুপের

চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেম বলেছেন, জীবনে বড় ভুল করেছি ইন্ডাস্ট্রি করে।
ইন্ডাস্ট্রি করলে শ্রমিক থাকবে। শ্রমিক থাকলে কাজ হবে। কাজ হলে আগুন
লাগতেই পারে। এর দায় কি আমার?’’
জোর করেই গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল:
শ্রমিকরা জানিয়েছেন, আগুন লাগার সময় ভবনের বিভিন্ন তলা ও সিঁড়ির গেট বন্ধ
ছিল। শ্রমিকদের অভিযোগ, গেট তালাবন্ধ রাখার কারণে মৃত্যু বেড়েছে। এছাড়ও
ভবনটির পঞ্চম তলায় প্রচুর দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুনের তীব্রতা ও
হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।


কারখানা সূত্রে জানা গেছে, ছয় তলা কারখানাটির প্রতিটি তলায় একটি করে সেকশন
ছিল। প্রতিটি সেকশনে একটি করে প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট রয়েছে। শ্রমিকদের
অভিযোগ, ভবনটির অধিকাংশ গেট বন্ধ থাকায় শ্রমিকরা বের হতে পারেনি। ফায়ার
সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর
রহমান বলেন, শুধু ভবনটির চতুর্থ তলার একটি কক্ষেই ৪৯টি লাশ ছিল।
এ ঘটনায় নিহতদের অধিকাংশই পুড়ে দগ্ধ হয়ে গেছেন। ফলে তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে
গেছে। এসব দেখে লাশ চেনাও যাচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার নিহতদের লাশ
শনাক্তে ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহে ঢামেকে কাজ শুরু করেছে সিআইডির ফরেনসিক
টিম।


নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চারতলার শ্রমিকরা কেউ বের
হতে পারেননি। সিকিউরিটি ইনচার্জ চারতলার কলাপসিবল গেটটি বন্ধ করে রাখায়
কোনো শ্রমিকই বের হতে পারেনি। প্রতিদিন ৪ তলায় ৭০-৮০ জন শ্রমিক কাজ
করতেন। চতুর্থ তলার শ্রমিকদের ইনচার্জ মাহবুব, সুফিয়া, তাকিয়া, আমেনা, রহিমা,
রিপন, কম্পা রানী, নাজমুল, মাহমুদ, ওমরিতা, তাছলিমাসহ প্রায় ৭০-৮০ জন শ্রমিকের
খবর পাওয়া যাচ্ছে না।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল
জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা দ্রুত এক থেকে তিন তলা
পর্যন্ত আগুন লাগে। পরে চার তলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। লাশ বেশিরভাগ চতুর্থ তলা
থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার করেছে
ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এদিকে বৃহস্পতিবার রাত থেকেই নিখোঁজ শ্রমিকদের দ্রুত

উদ্ধারের দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন স্বজন ও উত্তেজিত জনতা। ঘটনা
নিয়ন্ত্রণে আনতে শুক্রবার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে জেলা প্রশাসন। তবে
লাশ পেতে দিনভর কারখানার সামনে অবস্থান করেছেন নিহতের স্বজনরা। সে সময়
তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং আহাজারি করতে থাকেন।
জানা গেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভবনটিতে আগুন লেগে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। আগুন
নিয়ন্ত্রণে আনতে ডেমরা, কাঞ্চন, সিদ্ধিরগঞ্জ, আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকা
থেকে ফায়ার সার্ভিসের মোট ১৮টি ইউনিট কাজ করে শুক্রবার দুপুরের দিকে আগুন
নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় টানা প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা সময় ধরে কাজ
করেছেন তারা। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পরপরই কারখানায় উদ্ধার তৎপরতা
চালানো হয়।


আর্থিক সহায়তার আশ্বাস
শুক্রবার বিকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রূপগঞ্জের স্থানীয় সংসদ সদস্য,
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক। নিহতদের পরিবারের
স্বজনদের আর্থিক সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী জানান, ক্ষতিগ্রস্ত
পরিবারগুলোকে সহায়তার ব্যাপারে কারখানাটির মালিকপক্ষের সঙ্গে তিনি কথা
বলবেন। নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের পরিবার যাতে সচ্ছলভাবে চলতে পারে সে
ব্যাপারে মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটা ব্যবস্থা করা হবে
বলে জানান তিনি। এদিকে নিহতদের লাশ দাফনের জন্য ২৫ হাজার এবং আহতদের ১০
হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
ঘটনা তদন্তে ৩ কমিটি
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে র‌্যাবের মহাপরিচালক চৌধুরি আবদুল্লাহ আল মামুন
গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জেলা প্রশাসন, ফায়ার
সার্ভিস ও কলকারখানা অধিদফতর থেকে গঠিত পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটিকে র‌্যাব
সার্বিকভাবে সহায়তা করবে। এই তিন তদন্ত কমিটির তদন্তে দোষীদের চিহ্নিত করা
সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Sharing is caring!