উইঘুরদের নিপীড়ন নিয়ে ইমরান খানের মন্তব্যে সমালোচনার ঝড়

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান এবং জিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের নিপীড়নের ব্যাপারে মন্তব্য করে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এইচবিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আফগানিস্তানে অভিযান চালানোর জন্য তিনি পাকিস্তানকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেবেন না। কাশ্মিরে ভারত যা করছে, তা নিয়ে বিশ্ব নীরব থাকলেও জিনজিয়াং নিয়ে কেন এত কথা বলছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন পাকিস্তানের এই প্রধানমন্ত্রী।

ইমরান খানের এই মন্তব্য ভারত এবং পাকিস্তানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সোমবার সকালের দিকে ইমরান খানের ওই সাক্ষাৎকারের একাংশ অ্যাক্সিওসে সম্প্রচারিত হওয়ার পরপরই লোকজন এটি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু করেন।

অ্যাক্সিওসের সাংবাদিক জোনাথন সোয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইমরান খান বলেন, আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট এবং তালেবানের বিরুদ্ধে সীমান্ত সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে সিআইএকে কোনোভাবে পাকিস্তানে ঘাঁটি গড়ার অনুমতি দেবেন না।

আফগানিস্তান থেকে আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পরিকল্পনায় সঙ্কট তৈরি করতে পারে ইমরান খানের এই মন্তব্য। ইমরান খান সবসময়ই পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের বিরোধিতা করছেন। তার এই মন্তব্যের প্রতিফলন দেখা গেছে পাকিস্তানের সরকারি কর্মকর্তাদের মন্তব্যেও।

ইমরান খানের এই অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন অনেক পাকিস্তানি। যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি গড়তে না দিতে তিনি যে অবস্থান নিয়েছেন তার পক্ষে সমর্থন জানাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে হ্যাশট্যাগে অ্যাবসলিউটলিনট (#AbsolutelyNot) ট্রেন্ডে পরিণত হয়েছে দেশটিতে।

জিনজিয়াংয়ের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীনের নিপীড়নের ব্যাপারে ইমরান খানের সাক্ষাৎকার সোমবার প্রকাশ করেছে অ্যাক্সিওস। উইঘুর নিয়ে তার মন্তব্য অনেকে ভালোভাবে নিতে পারেননি।

যেকোনও ইস্যুতে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করে বলে মন্তব্য করেন ইমরান খান। একই সঙ্গে তিনি কাশ্মিরকে ‌‘বিশ্বের উন্মুক্ত কারাগার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রশ্ন করেন ‘কাশ্মিরে ভারত যা করছে, সেটি কেন ইস্যু হচ্ছে না? এটি এক ধরনের ভণ্ডামি।’

পুরো কাশ্মির অঞ্চলকে ভারত এবং পাকিস্তান নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে। যদিও উভয় দেশ কাশ্মিরের একাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ব্যাপক বিবাদপূর্ণ এই অঞ্চল নিয়ে ইতোমধ্যে পারমাণবিক অস্ত্রধারী এ দুই প্রতিবেশি দেশ দু’বার যুদ্ধে জড়িয়েছে। প্রায়ই বিতর্কিত এই অঞ্চলের সীমান্তে উভয় দেশের সামরিক বাহিনীর সংঘর্ষের খবর আসে।

২০১৯ সালের আগস্টে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধানের বিশেষ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর দুই দেশের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেই সময় লাখ লাখ সৈন্য অধিকৃত কাশ্মিরে সরিয়ে নেয় ভারত, বন্দি করা হয় নির্বাচিত রাজনীতিকসহ হাজার হাজার মানুষকে।

ওই সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কাশ্মির নিয়ে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া এক ভাষণে বিশ্ব নেতাদের সতর্ক করে দেন তিনি।

অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইমরান খান পাকিস্তানের সীমান্তে চীনও আছে ইঙ্গিত করে বলেন, আমাদের সীমান্তে যা ঘটছে, সেব্যাপারে আমি জানি।

ইমরান খান বলেন, ‘চীন যে পথে আছে, সেটাকে সম্মান জানায় পাকিস্তান। আমাদের সমস্যা যেটাই হোক না কেন আমরা রুদ্ধদ্বার আলোচনা করি।’ তিনি বলেন, একেবারে কঠিন সময়েও পাকিস্তানের সেরা বন্ধু ছিল চীন। যখন আমরা সত্যিই লড়াই করছিলাম এবং আমাদের অর্থনীতি যখন লড়াই করছিল, তখন আমাদের উদ্ধারে তারা এগিয়ে এসেছিল।

ইমরান খানের এসব মন্তব্য ভারত এবং পাকিস্তানে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে। তবে বেশিরভাগ মানুষই ইমরান খানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। একই সঙ্গে তারা ইমরান খান চীনের কাছে বিক্রি হয়ে গেছেন বলেও মন্তব্য করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু ব্যবহারকারী পাক প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যকে ‘নৈতিকতার দিক থেকে একেবারে কাপুরুষোচিত’ বলে অভিহিত করেছেন। পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক মেহদি হাসান বলেছেন, এই সাক্ষাৎকার দেখাও অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

ভারত এবং কাশ্মির নিয়ে ইমরান খানের মন্তব্যে ক্ষেপেছেন ভারতীয়রাও। তারা ইমরান খান চীনের কাছে বিক্রি হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এবং বলেছেন, তাকে কখনই পাত্তা দেওয়া হবে না।

নয়াদিল্লি যদি কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা ফিরিয়ে দেয় তাহলে ভারতের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে বলে ইমরান খান যে প্রস্তাব দিয়েছেন; সেটিকেও এক ধরনের ভণ্ডামি বলে অভিহিত করেছেন ভারতীয়রা।

Sharing is caring!